সালাত/নামায

১১২. ইশরাক, চাশত, আউয়াবীন, তাহাজ্জুদ ও যাওয়াল-এর সময় ও ফজীলত প্রসঙ্গে

☞ প্রশ্ন

মুহতারাম মুফতি সাহেব!

ইশরাক, চাশত, আউয়াবীন, তাহাজ্জুদ ও যাওয়ালের নামাযের সময় এবং এ নামাযসমূহের ফজীলত সম্পর্কে জানতে চাই। এ নামাযগুলোর গুরুত্ব কতটুকু এবং এ নামাযগুলো সুন্নাত না নফল? বিস্তারিত হাওয়ালাসহ জানালে কৃতজ্ঞ হবো!

দোয়া করি আল্লাহ তায়ালা আপনার ইলম ও লিখনির মাঝে আরো বরকত দান করুন!

 উত্তর :

بسم الله الرحمن الرحيم

ইশরাক, চাশত, আউয়াবীন, তাহাজ্জুদ ও যাওয়ালের নামায নফল পর্যায়ের। রাসূলুল্লাহ (সা.) ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নাতের পর নফল আমলের প্রতি উম্মতকে উৎসাহিত করেছেন।

নবী কারীম (সা.) ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তায়ালা বলেন— আমার বান্দা নফলের মাধ্যমে আমার নিকটবর্তী হতে থাকে। একপর্যায়ে সে আমার মাহবুব ও ভালোবাসার পাত্র হয়ে যায়। (সহীহ বুখারী, ২য় খণ্ড, ৯৬৩ পৃষ্ঠা)

এরূপ নফল নামাযসমূহের মধ্যে তাহাজ্জুদ নামায ফজীলতের দিক দিয়ে অন্যতম। সেই সাথে ইশরাক, চাশত ও আউয়াবীন ইত্যাদি সময়সংশ্লিষ্ট নফল নামাযেরও অনেক ফজীলতের বর্ণনা হাদীস শরীফে এসেছে।

এ ধরনের ফজীলতপূর্ণ নফল আমলের কারণে অন্যান্য নবীর উম্মতের তুলনায় এ উম্মতের বয়সসীমা কম হলেও এসব অতিরিক্ত আমলের দ্বারা ছাওয়াব বেশি হওয়ার মাধ্যমে অন্য সকল উম্মতের তুলনায় এ উম্মতের আমলের আধিক্য হবে বলে হাদীসে রয়েছে। তাই নিয়মিত ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নাত আমল আদায়ের পর যাদের সময়-সুযোগ হয়, তাদের এ নফল নামায এবং অন্যান্য নফল আমলে তৎপর হওয়া উত্তম নেক কাজ।

নিম্নে ইশরাক, চাশত, আউয়াবীন, তাহাজ্জুদ এবং যাওয়ালের নামাযের সময় ও ফজীলত ক্রমানুসারে উল্লেখ করা হলো—

ইশরাকের সময় ও তার ফজীলত

ফজরের নামায পড়ার পর দুনিয়ার কাজকর্ম ও কথাবার্তা থেকে বিরত থেকে সূর্য ওঠা পর্যন্ত স্বীয় নামাযের জায়গায় বা (পুরুষগণ) মসজিদে অন্য কোনো জায়গায় বসে কুরআন তিলাওয়াত, যিকির-আযকার, তাসবীহ-তাহলীল ইত্যাদিতে লিপ্ত থাকবেন। অতঃপর সূর্যোদয়ের ১২/১৩ মিনিট পর সূর্য একটু উপরে উঠলে তখন ইশরাকের সময় হয়— ঐ সময় দুই রাক‘আত ইশরাকের নামায পড়লে এক হজ্ব ও এক উমরার সমান ছাওয়াব লাভ হবে বলে হাদীসে রয়েছে। (জামে তিরমিযী, ১ম খণ্ড, ১৩০ পৃষ্ঠা)

এতদ্ব্যতীত আরো দুই রাক‘আতসহ মোট চার রাক‘আত নামায পড়লে আল্লাহ তায়ালা সন্ধ্যা পর্যন্ত তার এদিনের সকল কাজের জিম্মাদার হয়ে যান বলে অপর হাদীসে উল্লেখ আছে। (জামে তিরমিযী, ১ম খণ্ড, ১০৮ পৃষ্ঠা)

অবশ্য যদি কেউ ফজরের নামাযের পর দুনিয়াবী কাজে লিপ্ত হয়ে যায় এবং সূর্য ওঠার পর ইশরাক পড়ে, তাও জায়িয আছে। এতেও ইশরাক আদায় হবে।

চাশতের সময় ও তার ফজীলত

সূর্য যখন আকাশে এক চতুর্থাংশ উপরে উঠে এবং সূর্যের তাপ প্রখর হয়, তখন থেকে দ্বিপ্রহরের আগ পর্যন্ত (৯টা থেকে ১১টার মধ্যে) চাশতের সময়। তখন দুই, চার বা আট রাক‘আত নামায পড়বেন। একে চাশতের নামায বলে। হাদীস শরীফে আছে— চাশতের দুই রাক‘আত নামাযে শরীরের সর্বমোট ৩৬০টি জোড়ার সদকা আদায় হয়ে যায় এবং সমুদ্রের ফেনার সমান গুনাহ (সগীরা) হলেও মাফ হয়ে যায়। অপর হাদীসে আছে— তার জন্য জান্নাতে একটি বালাখানা তৈরি করা হয়। এছাড়াও হাদীসে চাশতের নামাযের আরো অনেক ফজীলত বর্ণিত হয়েছে।

আউয়াবীনের নামাযের সময় ও তার ফজীলত

মাগরিবের ফরজ ও সুন্নাতের পর ইশার ওয়াক্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আউয়াবীনের নামাযের সময়। এ সময়ে নফলের নিয়তে কমপক্ষে ছয় রাক‘আত, ঊর্ধ্বে বিশ রাক‘আত পর্যন্ত এ নামায পড়া যায়। এ নামাযকে আউয়াবীনের নামায বলে।

হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি মাগরিবের সুন্নাতের পর ছয় রাক‘আত নফল নামায পড়বে, সে বারো বছর ইবাদতের সমান ছাওয়াব লাভ করবে। (জামে তিরমিযী, ১ম খণ্ড, ৯৮ পৃষ্ঠা)

তাহাজ্জুদ নামাযের সময় ও তার ফজীলত

নফল নামাযসমূহের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে তাহাজ্জুদ নামায। পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরজ হওয়ার পূর্বে এ নামায ফরজ ছিলো। পরবর্তীতে তা নফল গণ্য হয়। এ নামায সম্পর্কে নবী কারীম (সা.) ইরশাদ করেন, ফরজ নামাযের পর শ্রেষ্ঠ নামায হলো— রাতের নামায (তাহাজ্জুদ)। (জামে তিরমিযী, ১ম খণ্ড, ৯৯ পৃষ্ঠা)

শেষ রাতে ত্রিপ্রহরের সময় (সাহরীর সময়) থেকে সুবহে সাদিকের পূর্ব পর্যন্ত এ নামাযের সময়। তবে দিনের কঠোর পরিশ্রমে যাদের শেষ রাতে ওঠা অনিশ্চিত হয়, তারা ইশার পর ঘুমানোর পূর্বে তাহাজ্জুদের নিয়তে ২/৪ রাক‘আত নামায পড়ে নিতে পারেন। এরপর সম্ভব হলে আবার শেষ রাতে উঠে তাহাজ্জুদ পড়বেন। আর তখন না উঠতে পারলে প্রথম রাত্রির সেই নামাযের কারণে তাহাজ্জুদের ফজীলত থেকে একেবারে মাহরূম হবেন না, আশা করি।

যাওয়ালের সময় ও তার ফজীলত

‘যাওয়ালের নামায’ একটি ফজীলতপূর্ণ নফল নামায। এ নামায দুপুরে সূর্য পশ্চিম দিকে ঢলে পড়ার সাথে সাথে আদায় করতে হয়। যেমন, নামাযের স্থায়ী সময়সূচি ক্যালেন্ডারে যোহরের যে শুরু ওয়াক্ত দেওয়া হয়, সেটাই সূর্য ঢলার সময়। সেই সময় হওয়ার সাথে সাথে যাওয়ালের নামায হিসেবে চার রাক‘আত নফল নামায পড়তে হয়।

এ সময়ের নামাযের ফজীলত হলো— এ সময় আল্লাহ তায়ালা আসমানের সব দরজা খুলে দেন এবং সহজভাবে সব ইবাদত-বন্দেগী ও দু‘আ কবুল হয়। (জামে তিরমিযী, ৪৭৮ নং হাদীস)

والله أعلم

☞ প্রামাণ্যগ্রন্থাবলী :

১. তিরমিযী শরীফ, ১ম খণ্ড, ১০৮ পৃষ্ঠা।

২. মিশকাত শরীফ, ১ম খণ্ড, ১১৬ পৃষ্ঠা।

৩. ফতোয়ায়ে শামী, ১ম খণ্ড, ৫০৬ পৃষ্ঠা।

৪. ফতোয়ায়ে আলমগীরী, ১ম খণ্ড, ১৪৮ পৃষ্ঠা।

৫. দুররে মুখতার, ১ম খণ্ড, ৪৯৮ পৃষ্ঠা।

৬. রদ্দুল মুহতার, ১ম খণ্ড, ৫০৬ পৃষ্ঠা।

৭. মারাকিউল ফালাহ, ২১৬, ২১৭ পৃষ্ঠা।

৮. বেহেশতী জেওর, ২য় খণ্ড, ২১২-২১৩ পৃষ্ঠা।

Leave a Reply

Back to top button