• ৯৭. নামাযে কাতার সোজা করার নিয়ম সম্পর্কে

    ☞ প্রশ্ন

    আসসালামু আলাইকুম!

    মহামান্য মুফতি সাহেব!

    নামাযের মধ্যে কাতার সোজা করার সঠিক নিয়ম কোনটি? পায়ের গোড়ালি দ্বারা কাতার সোজা করা, নাকি পায়ের আঙ্গুল দ্বারা কাতার সোজা করা? অর্থাৎ দাগের মধ্যে পায়ের গোড়া রাখা, নাকি আঙ্গুল রাখা?

    আর পায়ের আঙ্গুল দ্বারা কাতার সোজা করলে কাতার সোজা হবে কি না? একজন মুহাদ্দিস সাহেব বলেছেন যে, কাতার সোজা হবে। এবং উক্ত মুহাদ্দিস সাহেবের কথা অনুযায়ী আমাদের মসজিদে প্রায় ৫/৭ বছর যাবত পায়ের আঙ্গুল দ্বারাই কাতার সোজা করে নামায আদায় করা হচ্ছে। কিন্তু ঘটনাক্রমে কোনো একদিন ঢাকা মাদানীনগর মাদরাসার একজন মুফতি সাহেব আমাদের মসজিদে নামায আদায় করেন। অতঃপর তিনি বলেন যে, কাতার সোজা করার নিয়ম হলো পায়ের গোড়ালি দ্বারা কাতার সোজা করা। পায়ের আঙ্গুল দ্বারা কাতার সোজা হয় না। এখন আমরা কার কথার উপর আমল করবো! অনুগ্রহপূর্বক সঠিক সমাধান জানালে বড়ই কৃতজ্ঞ হবো।

     উত্তর :

    بسم الله الرحمن الرحيم

    নামাযের মধ্যে কাতার সোজা করা বিশুদ্ধ মতে সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ। কাতার সোজা করা সম্পর্কে হযরত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: তোমরা নামাযের কাতার সোজা করো, অন্যথায় আল্লাহ তায়ালা তোমাদের চেহারা পরিবর্তন করে দিবেন এবং তোমাদের মনসমূহ বাঁকা করে দিবেন। সুতরাং, নামাযের মধ্যে কাতার সোজা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

    আর কাতার সোজা করার সঠিক পদ্ধতি হলো একজনের পায়ের গোড়ালি অপর জনের গোড়ালি বরাবর এবং একজনের কাঁধ অপর জনের কাঁধ বরাবর রাখা। আর যদি কোনো মসজিদে কাতার সোজা করার জন্য দাগ দেওয়া থাকে, তাহলে দাগের উপর পায়ের গোড়ালি রেখে কাতার সোজা করতে হবে। অন্যথায় দাগের মধ্যে পায়ের আঙ্গুল দিয়ে দাঁড়ালে কাতার সোজা হবে না।

    আর উক্ত মুহাদ্দিস সাহেবের কথা সঠিক নয়। কিন্তু মাদানীনগর মাদরাসার মুফতি সাহেবের কথা সঠিক।

    والله أعلم

    ☞ প্রামাণ্যগ্রন্থাবলী :

    ১. ফতোয়ায়ে শামী, ১ম খণ্ড, ৫৬৮ পৃষ্ঠা।

    ২. ফতোয়ায়ে আলমগীরী, ১ম খণ্ড, ৮৯ পৃষ্ঠা।

    ৩. ফতোয়ায়ে দারুল উলূম, ৩য় খণ্ড, ৩৩৭ পৃষ্ঠা।

    ৪. ফতোয়ায়ে জামেয়া, ১ম খণ্ড, ১৪৩ পৃষ্ঠা।

    ৫. ফতোয়ায়ে রহমানিয়া, ১ম খণ্ড, ২৬৭ পৃষ্ঠা।

    ৬. ফতোয়ায়ে রহিমিয়া, ৪র্থ খণ্ড, ৩১৯ পৃষ্ঠা।

    ৭. দুররে মুখতার, ১ম খণ্ড, ৪২০ পৃষ্ঠা।

    ৮. আবু দাউদ শরীফ, ১ম খণ্ড, ৯৬ পৃষ্ঠা।

    ৯. মিশকাত শরীফ, ১ম খণ্ড, ৯৮ পৃষ্ঠা।

  • ৮৭. ছবিযুক্ত মোবাইল নিয়ে নামায আদায় করা সম্পর্কে

    ☞ প্রশ্ন

    মুহতারাম মুফতি সাহেব!

    বর্তমান এই আধুনিক যুগে অনেকের মোবাইলেই অশ্লীল ছবি বা অশ্লীল ভিডিও অথবা নগ্ন ছবি বা নগ্ন ভিডিও, গান, কৌতুক ইত্যাদি বহু কিছু থাকে, যা ইসলামে হারাম। এখন আমার জানার বিষয় হলো, এরূপ মোবাইল নিয়ে নামায আদায় করলে নামায সহীহ হবে কি না?

     উত্তর :

    بسم الله الرحمن الرحيم

    মোবাইলে অশ্লীল ছবি, অশ্লীল ভিডিও বা নগ্ন ছবি, নগ্ন ভিডিও, গান, কৌতুক ইত্যাদি সংরক্ষণ করে রাখা বা দেখা সম্পূর্ণ নাজায়েয ও হারাম। তবে এরূপ মোবাইল সঙ্গে নিয়ে নামায আদায় করলে নামায সহীহ হবে। কেননা, মোবাইলে ছবি বা ভিডিওগুলো এমনভাবে সেভ করা থাকে, যা প্রোগ্রাম খোলা ব্যতীত দেখা সম্ভব নয়। সুতরাং, এমন মোবাইল সঙ্গে নিয়ে নামায আদায় করা জায়েয হবে। তবে মোবাইলের স্ক্রিনে ছবি দৃশ্যমান হলে ওই মোবাইল সামনে রেখে নামায আদায় করলে মাকরূহে তাহরীমী হবে।

    ☞ প্রামাণ্যগ্রন্থাবলী :

    ১. ফতোয়ায়ে শামী, ৯ম খণ্ড, ৪১৬, ৫২০ পৃষ্ঠা।

    ২. ফতোয়ায়ে জামেয়া, ৬ষ্ঠ খণ্ড, ৭২৯ পৃষ্ঠা।

    ৩. ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া, ১ম খণ্ড, ১০৮ পৃষ্ঠা।

    ৪. ইমদাদুল ফতোয়া, ৪র্থ খণ্ড, ১৬৭ পৃষ্ঠা।

    ৫. আল বাহরুর রায়িক, ১ম খণ্ড, ৪৮ পৃষ্ঠা।

    ৬. ফাতহুল কদির, ১ম খণ্ড, ৪২৮ পৃষ্ঠা।

  • ৮৬. সম্মান প্রদর্শনের জন্য কোমর বাঁকা করা সম্পর্কে

    ☞ প্রশ্ন

    হযরত মুফতি সাহেব!

    আমি কোরিয়ার অধিবাসী। আপনার কাছে আমার জানার বিষয় হলো— কোরিয়ার ভিতরে সম্মান প্রদর্শনের নিয়ম হচ্ছে দুইজন সামনাসামনি দাঁড়িয়ে কোমর সামনের দিকে বাঁকা করে মাথা নিচু করা। এভাবে কাউকে সম্মান প্রদর্শন করা জায়েয আছে কি না?

     উত্তর :

    بسم الله الرحمن الرحيم

    না, এভাবে কাউকে সম্মান প্রদর্শন করা জায়েয নয়। কারণ, তা অমুসলিমদের তরিকা। আর কোনো মুসলিমের জন্য অমুসলিমদের তরিকা গ্রহণ করা জায়েয নয়। কেননা, হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে, যে অন্য কোনো সম্প্রদায়ের অনুসরণ-অনুকরণ করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে।

    ☞ প্রামাণ্যগ্রন্থাবলী :

    ১. তিরমিযী শরীফ, ২য় খণ্ড, ১০৪ পৃষ্ঠা।

    ২. আবু দাউদ শরীফ, ২য় খণ্ড, ৭১০ পৃষ্ঠা।

    ৩. মিশকাত শরীফ, ২য় খণ্ড, ৪০৩ পৃষ্ঠা।

    ৪. ফতোয়ায়ে মাহমুদিয়া, ১৯শ খণ্ড, ১২০ পৃষ্ঠা।

    ৫. ফতোয়ায়ে জামেয়া, ৫ম খণ্ড, ৩১৪ পৃষ্ঠা।

    ৬. জামেউল ফতোয়া, ৯ম খণ্ড, ১৯৫ পৃষ্ঠা।

  • ৮২. ইমাম নির্বাচিত করা সম্পর্কে

    ☞ প্রশ্ন

    ফরিদপুর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

    আসসালামু আলাইকুম!

    মুহতারাম মহামান্য মুফতি সাহেব!

    আমি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে আপনার কাছে জানতে চাচ্ছি, ইমাম হওয়ার জন্য সর্বাধিক যোগ্য ব্যক্তি কে? হাওয়ালাসহ জানালে বড়ই কৃতজ্ঞ হবো।

     উত্তর :

    بسم الله الرحمن الرحيم

    ফতোয়ায়ে শামীতে বর্ণিত আছে, ইমাম হওয়ার জন্য সর্বাধিক যোগ্য তিনি, যিনি নিচের গুণগুলোতে এগিয়ে। প্রতিটি ধাপে সবাই সমান হলে পরের ধাপটি দেখা হবে, ক্রমানুসারে:

    ১. কুরআনী ইলমে সর্বাধিক জ্ঞানী।

    ২. সুন্নাহর ইলমে সর্বাধিক জ্ঞানী।

    ৩. ফিকহের ইলমে সর্বাধিক জ্ঞানী।

    ৪. সর্বাধিক মুত্তাকী।

    ৫. সর্বাধিক পরহেজগার।

    ৬. সর্বাধিক চরিত্রবান।

    ৭. সর্বাধিক বয়স্ক।

    ৮. সর্বাধিক ভদ্র।

    ৯. সুকণ্ঠের অধিকারী।

    ১০. সর্বাধিক সুন্দর।

    ১১. যার স্ত্রী সর্বাধিক সুন্দরী।

    ১২. সর্বাধিক সুন্দর পোশাক পরিধানকারী।

    ১৩. সর্বাধিক সুস্বাস্থ্যের অধিকারী।

    যদি এসব ক্ষেত্রেও সবাই সমান হয়, তাহলে লটারির মাধ্যমে বা সবার মতামত নিয়ে ইমাম নির্বাচিত করবে।

    ☞ প্রামাণ্যগ্রন্থাবলী :

    ১. ফতোয়ায়ে শামী, ১ম খণ্ড, ৫২৩-৫২৫ পৃষ্ঠা।

    ২. ফতোয়ায়ে আলমগীরী, ১ম খণ্ড, ৮৩ পৃষ্ঠা।

    ৩. ফতোয়ায়ে উসমানী, ২য় খণ্ড, ১০৮-১১০ পৃষ্ঠা।

    ৪. ফতোয়ায়ে রহমানিয়া, ১ম খণ্ড, ২৩৭ পৃষ্ঠা।

    ৫. আদ দুররুল মুখতার, ১ম খণ্ড, ৫৫৮ পৃষ্ঠা।

    ৬. রদ্দুল মুহতার, ১ম খণ্ড, ৪১২ পৃষ্ঠা।

    ৭. বেহেশতী গাওহার, ১১শ খণ্ড, ৪৭ পৃষ্ঠা।

    ৮. শরহে বেকায়া, ১ম খণ্ড, ৩৫২ পৃষ্ঠা।

    ৯. মারাকিউল ফালাহ, ১৬৩ পৃষ্ঠা।

  • ৭৮. ইমামতির নিয়ত সম্পর্কে

    ☞ প্রশ্ন

    হুজুর কেমন আছেন?

    আমার দুটি মাসআলা জানা একান্ত জরুরি। তা হলো, ইমামদের জন্য নামাযের নিয়তের হুকুম কী? তারা কীভাবে নামাযের নিয়ত করবে? আর বর্তমানে প্রচলিত নামাযের নিয়তের হুকুম কী?

    প্রশ্নকারী :

    মাওলানা হযরত আলী, জলঢাকা, রংপুর, বাংলাদেশ।

     উত্তর :

    بسم الله الرحمن الرحيم

    নামাযের নিয়ত করা ফরয। ইমামদের জন্য শুধু নিজের নামাযের নিয়ত করা ফরয, ইমামতির নিয়ত করা ফরয নয়।

    কিন্তু মুক্তাদির জন্য ইমামের ইকতিদার নিয়ত করা ফরয।

    আর নিয়ত হলো মনের ইচ্ছা, ইরাদা বা সংকল্প। অর্থাৎ মনের ইচ্ছাকেই নিয়ত বলে। সুতরাং মুখে উচ্চারণ করার নাম নিয়ত নয়।

    والله اعلم بالصواب

    ☞ প্রামাণ্যগ্রন্থাবলী :

    ফতোয়ায়ে শামী, ১ম খণ্ড, ৩৯৪ পৃষ্ঠা।

    ফতোয়ায়ে দারুল উলুম, ২য় খণ্ড, ১৪৯ পৃষ্ঠা।

    ফতোয়ায়ে রহমানিয়া, ১ম খণ্ড, ৩৭১ পৃষ্ঠা।

    ইমদাদুল ফতোয়া, ১ম খণ্ড, ১৯৪ পৃষ্ঠা।

    বেহেশতী জেওর, ২য় খণ্ড, ১১৪ পৃষ্ঠা।

    আশরাফুল হিদায়া, ১ম খণ্ড, ৩১৫ পৃষ্ঠা।

    আল বাহরুর রায়িক, ১ম খণ্ড, ২৭৮ পৃষ্ঠা।

    উত্তর লিখনে :

    মুফতী তাহমীদ শামী, অনলাইন ফতোয়া বিভাগ, বাংলাদেশ।

  • ৬৬. ভোট দেওয়া সম্পর্কে

    ☞ প্রশ্ন

    জনাব মুফতি সাহেব!

    আলেম সমাজ বলছেন, ভোট একটি আমানত। এই আমানতের যথাযথ ব্যবহার করতে হবে, এর খেয়ানত করা যাবে না।

    এখন আমার প্রশ্ন হলো, আমরা সাধারণ মানুষ কী করব?

    দেখা যায়, কোথাও মেয়র আলেম হলে কাউন্সিলররা সব চোর-বদমাশ। আবার কাউন্সিলর ভালো পাওয়া গেলে মেয়র প্রার্থীরা সব দুর্নীতিবাজ। আবার মহিলা প্রার্থীও আছেন। এখন আমরা কী করব? কাকে ভোট দেব? আমি ফতোয়া বিভাগ, বাংলাদেশ থেকে এর সমাধান চাচ্ছি।

     উত্তর :

    بسم الله الرحمن الرحيم

    বর্তমান প্রচলিত রাজনীতি তথা গণতন্ত্র যেমন ইসলামবিরোধী, তেমনি গণতান্ত্রিক নির্বাচন পদ্ধতিও ইসলামী নীতির পরিপন্থী। তাই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে শরিক হওয়া কোনো মুসলিমের জন্য জায়েয হবে না।

    তবে গণতন্ত্র যেহেতু ইসলামের শত্রুদের পক্ষ থেকে আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, এবং ব্যক্তিবিশেষের পক্ষে তা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসা কঠিন, তাই আন্দোলনে শরিক না হয়ে শুধু ভোটের সময় সব প্রার্থীর মধ্যে তুলনামূলকভাবে ইসলাম, দেশ ও জাতির জন্য মঙ্গলজনক, অথবা কমপক্ষে ইসলামের জন্য তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিকর প্রার্থীকে ভোট দেওয়া জায়েয আছে।

    এ ক্ষেত্রে একটি বিষয় বিবেচ্য। সব সৎ মানুষ যদি ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকেন, তাহলে অসৎ মানুষেরা অসৎ প্রার্থীকেই নির্বাচিত করবে। তখন সবাইকে অসৎ লোকের ফিতনায় পড়তে হবে, এবং ইসলাম ও মুসলিমদের আরও বেশি ক্ষতি হবে।

    তাছাড়া ভোট দেওয়া মূলত সাক্ষ্য দেওয়া। আর ন্যায়ের ব্যাপারে সাক্ষ্য দেওয়া জরুরি। সুতরাং ওজর ছাড়া তুলনামূলক যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকা জায়েয নয়।

    ☞ প্রামাণ্যগ্রন্থাবলী :

    সূরা বাকারা, ২৮৩ নং আয়াত।

    সূরা নিসা, ১৩৫ নং আয়াত।

    সূরা আনআম, ১১৭ নং আয়াত।

    তাফসিরে ইবনে কাসির, ২য় খণ্ড, ৫৯৪ পৃষ্ঠা।

    মাআরিফুল কুরআন, ১ম খণ্ড, ২৮৭ পৃষ্ঠা।

    আবু দাউদ শরীফ, ৪র্থ খণ্ড, ১১২ পৃষ্ঠা।

    ফতোয়ায়ে রহমানিয়া, ২য় খণ্ড, ৩৬৪ পৃষ্ঠা।

    জাওয়াহিরুল ফিকহ, ২য় খণ্ড, ২৯৩ পৃষ্ঠা।

    ফিকহী মাকালা, ২য় খণ্ড, ২৮৬ পৃষ্ঠা।

  • ৪৬৭. হাফেজা মেয়েকে গায়রে হাফেজ ছেলের বিবাহের বিধান

    ☞ প্রশ্ন 😕
    মাননীয় মুফতী সাহেব!
    আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে যে, হাফেজা মেয়েকে গায়রে হাফেজ ছেলে বিবাহ করতে পারবেনা। কারণ, কুরআনের উপর কোন কিছু রাখা জায়েয নাই। আর হাফেজা মেয়ে কুরআনের মতই। প্রচলিত এ কথা সঠিক কিনা? দলীলসহ জানতে চাই!
    প্রশ্নকারী :
    এস এম সগীর বিন মানসুর
    নরসিংদী, ঢাকা, বাংলাদেশ।

     উত্তর :

    بسم الله الرحمن الرحيم
    হাফেজা মেয়েকে গায়রে হাফেজ ছেলে বিবাহ করতে পারবে না বলে প্রচলিত কথাটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। বরং গায়রে হাফেজ বা জেনারেল শিক্ষিত ছেলে যদি দ্বীনদার ও পরহেযগার হয়, তবে হাফেজা বা আলেমা মেয়েকে বিবাহ করতে পারবে। এতে কোন সমস্যা নেই। যেমন হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে-
    عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِذَا خَطَبَ إِلَيْكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ دِينَهُ وَخُلُقَهُ فَزَوِّجُوهُ، إِلاَّ تَفْعَلُوا تَكُنْ فِتْنَةٌ فِي الأَرْضِ، وَفَسَادٌ عَرِيضٌ

    হযরত আবূ হুরায়রা রা : থেকে বর্ণিত : হযরত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : যখন তোমাদের কাছে এমন লোক বিবাহের প্রস্তাব দেয়, যার দ্বীনদারী ও চরিত্র তোমরা পছন্দ কর, তবে বিবাহ দিয়ে দাও! যদি তা না কর তবে পৃথিবীতে বিপর্যয় ও ফিতনা-ফাসাদ দেখা দিবে। সনদ হাসান সহীহ। (সুনানে তিরমিযী ১০৮৪ নং হাদীস।)
    অপর হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-

    عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَمْرٍو أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ إِنَّمَا الدُّنْيَا مَتَاعٌ وَلَيْسَ مِنْ مَتَاعِ الدُّنْيَا شَيْءٌ أَفْضَلَ مِنْ الْمَرْأَةِ الصَّالِحَةِ
    হযরত আবদুল্লাহ বিন আমর রাযি : থেকে বর্ণিত : হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : গোটা দুনিয়াই হলো সম্পদ। আর দুনিয়ার মধ্যে পুণ্যবতী স্ত্রীলোকের চেয়ে অধিক উত্তম কোন সম্পদ নাই। সনদ সহীহ। (সুনানে ইবনে মাযাহ ১৮৫৫ হাদীস।)
    অপর হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-

    عَنْ أَبِيهِ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنْ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ تُنْكَحُ الْمَرْأَةُ لأرْبَعٍ لِمَالِهَا وَلِحَسَبِهَا وَجَمَالِهَا وَلِدِينِهَا فَاظْفَرْ بِذَاتِ الدِّينِ تَرِبَتْ يَدَاكَ.

    হযরত আবূ হুরায়রা রাযি : থেকে বর্ণিত :
    হযরত নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : চারটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রেখে মেয়েদেরকে বিয়ে করা হয় : ১। তার সম্পদ। ২। তার বংশমর্যাদা। ৩। তার সৌন্দর্য। ৪। তার দ্বীনদারী। সুতরাং তুমি দ্বীনদারীকেই প্রাধান্য দেবে নতুবা তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সনদ সহীহ।
    (সহীহুল বুখারী ৫০৯০ নং হাদীস।)

    উল্লেখিত হাদীস সমূহে পাত্র-পাত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে দ্বীনদারীত্বকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। আর হাফেজা ও আলেমা মেয়েরা সাধারণভাবেই দ্বীনদার। তাছাড়া নিজে হাফেজ বা আলেম না হয়েও হাফেজা বা আলেমা মেয়েকে বিবাহ করতে পারা বড়ই সৌভাগ্যের ব্যাপার।

    والله اعلم بالصواب

    ☞ প্রামাণ্যগ্রন্থাবলী :
    আল কুরআন সূরা নিসা ৩, ২৪ নং আয়াত।
    আল কুরআন সূরা নুর ২৬ নং আয়াত।
    সহীহুল বুখারী ৫০৯০ নং হাদীস।
    সুনানে ইবনে মাযাহ ১৮৫৫ নং হাদীস।
    সুনানে তিরমিযী ১০৮৪ নং হাদীস।
    ফতোয়ায়ে রহিমীয়া ৩/১৪২ পৃষ্ঠা।
    ফতোয়ায়ে ইউনুসিয়া ৭/২১০ পৃষ্ঠা।
    ফতোয়ায়ে রহমানিয়া ২/৭৭ পৃষ্ঠা।
    ☞ উত্তর লিখনে :
    মুফতী তাহমীদ শামী
    আত তাহমীদ ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ।
    তারিখ-১৫/১১/২০২২ ঈসায়ী।

  • ৪৬৮. প্রথম বিবাহের এক ঘন্টা পর দ্বিতীয় বিবাহের বিধান

    👉 প্রশ্ন :
    মুহতারাম মুফতী সাহেব!
    জনৈক ব্যক্তি এক সাথে দুই মেয়েকে বিবাহ দিল। বিবাহ পড়ানোর সময় কাজী সাহেব বড় মেয়ের বিবাহ ছোট ছেলের সাথে ও ছোট মেয়ের বিবাহ বড় ছেলের সাথে পড়িয়ে দিল। অতঃপর এক ঘণ্টা পর কাজী সাহেব এসে বলতে লাগলেন যে, বিবাহ ভুলে উল্টো পড়ানো হয়ে গেছে। তাই পুনরায় বিবাহ পড়াতে হবে। অতঃপর মেয়ে পরিবর্তন করে অর্থাৎ বড় মেয়ের সাথে বড় ছেলে ও ছোট মেয়ের সাথে ছোট ছেলের বিবাহ পড়ানো হলো। কিন্তু ছোট মেয়ের স্বামী দ্বিতীয় বিবাহ মানতে রাজি নন। কেননা তার বক্তব্য হলো দ্বিতীয় বিবাহ শুদ্ধ হয়নি। কিন্তু বড় মেয়ের স্বামী তার দ্বিতীয় বিবাহের স্ত্রীকে নিয়ে চলে গেল এবং সংসার করতে লাগলো। এ অবস্থায় শরীয়তের বিধান কি?
    👉 প্রশ্নকারী :
    এমডি মুহিব্বুল্লাহ ফরাজী
    কাতার প্রবাসী।

     উত্তর :

    بسم الله الرحمن الرحيم
    উল্লেখিত অবস্থায় প্রথম বিবাহ অর্থাৎ বড় মেয়ের সাথে ছোট ছেলে এবং ছোট মেয়ের সাথে বড় ছেলের বিবাহ সহীহ হয়েছে। কিন্তু পুনরায় এক ঘণ্টা পর কাজী সাহেব যে বিবাহ পড়িয়েছেন তা সহীহ হয়নি। কেননা কোন মেয়ে কারো বিবাহে থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় বিবাহ হারাম। তবে উক্ত বিবাহ যদি রদবদল করতেই হয় তাহলে তখন কর্তব্য ছিল প্রথমে উভয় স্ত্রীকে তালাক দিয়ে পুনরায় বিবাহ পড়িয়ে দেওয়া। আর বড় ছেলে দ্বিতীয় বিবাহের স্ত্রীকে তথা বড় মেয়েকে নিয়ে যে সংসার করেছে তা বৈধ হয়নি বরং যিনা হয়েছে। সুতরাং এখনি তাদেরকে পৃথক করে দিতে হবে। উল্লেখ্য : এখনো তাদের প্রথম বিবাহ বহাল রয়েছে।

    والله اعلم بالصواب

    👉 প্রামাণ্য গ্রন্থাবলী :
    আল কুরআন সূরা নিসা ২৪ নং আয়াত।
    তাফসীরে ইবনে কাসীর ৩/২১ পৃষ্ঠা।
    আহকামুল কুরআন ৩/৩০২ পৃষ্ঠা।
    ফতোয়ায়ে আলমগীরী ২/৫৩ পৃষ্ঠা।
    ফতোয়ায়ে উসমানী ৩/২৪৪ পৃষ্ঠা।
    ফতোয়ায়ে ইউনুসিয়া ৩/৪৫ পৃষ্ঠা।
    ফতোয়ায়ে কাসেমীয়া ২/২৫৭ পৃষ্ঠা।
    ফতোয়ায়ে মাহমুদিয়া ১০/৪০৮ পৃষ্ঠা।
    ফতোয়ায়ে শামী ৪/৪৫৬ পৃষ্ঠা।
    বেহেশতী জেওর ৪/৪১১ পৃষ্ঠা।

    👉 উত্তর লিখনে :
    মুফতী তাহমীদ শামী
    আত তাহমীদ ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ।
    তারিখ-০১/০১/২০২৩ ঈসায়ী।

  • ভ্যালেন্টাইন ডে বা বিশ্ব ভালোবাসা দিবস

    প্রেম-ভালোবাসা, মায়া-মমতা, স্নেহ-প্রীতি, ভক্তি-শ্রদ্ধা ইত্যাদি রবের পক্ষ হতে বান্দার প্রতি সীমাহীন অনুগ্রহ। এ মর্মে কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন :

    وَمِنْ اٰيٰتِهٖۤ اَنْ خَلَقَ لَكُمْ مِّنْ اَنْفُسِكُمْ اَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوْۤا اِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَّوَدَّةً وَّرَحْمَةً ؕ اِنَّ فِىْ ذٰ لِكَ لَاٰيٰتٍ لِّقَوْمٍ يَّتَفَكَّرُوْنَ.

    আর তাঁহার নিদর্শনাবলীর মধ্যে রহিয়াছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই সৃষ্টি করিয়াছেন তোমাদের সঙ্গিনীদেরকে, যাতে তোমরা তাদের নিকট শান্তি পাও এবং তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালবাসা ও দয়া সৃষ্টি করিয়াছেন। চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য এতে অবশ্যই বহু নিদর্শন রহিয়াছে। (সূরা রূম ২১ আয়াত।)

    তাই ভালোবাসা হলো আত্মার তৃপ্তি। মনের প্রশান্তি। জীবন চলার পাথেয়। আল্লাহ তায়ালা আমাদের অকৃত্রিম ভালোবাসা শিক্ষা দিয়েছেন, যা কোনো বিশেষ দিবসের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। ভালোবাসা, সম্প্রীতি ও উত্তম চরিত্র-মাধুর্য দ্বারা আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জয় করে নিয়েছেন শত কোটি মানুষের হৃদয়, বিশ্বময় ছড়িয়ে দিয়েছেন ইসলামের বিকিরণ। প্রতিটি ভালোবাসা হতে হবে আবেগ, বিবেক ও স্রষ্টার সম্মতির সমন্বয়। কিন্তু যে ভালোবাসা হয় শুধু আবেগ বা কু-প্রবৃত্তির, সে ভালোবাসা মানুষের ইহকাল-পরকাল উভয়কে ধ্বংস করে দেয়। ধ্বংস করে দেয় মানুষের মনুষ্যত্বকে, জাগরিত করে পশুত্বের হিংস্র বৈশিষ্ট্যকে।

    দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমান বিশ্বে ভালোবাসা দিবসের নামে উৎপত্তি হচ্ছে নানান অপসংস্কৃতি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। ছড়িয়ে পড়ছে অশ্লীলতা ও বেহায়াপনা। ক্রমে বৃদ্ধি পাচ্ছে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির আগ্রাসন। যা ইসলামের নীতি ও আদর্শবহির্ভূত। আর তাইতো নৈতিক অবক্ষয় দাবানলের মত ছড়িয়ে যাচ্ছে।

    ভালোবাসা দিবসের সূচনা :

    নোংরা ও জঘন্য ইতিহাসের স্মৃতিচারণের নাম বিশ্ব ভালবাসা দিবস। এ ইতিহাসটির বয়স ১৭৩৭ বছর হলেও বিশ্ব ভালবাসা দিবস নামে এর চর্চা শুরু হয় সাম্প্রতিক কালেই। ২৭০ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারির কথা। তখন রোমের সম্রাট ছিলেন ক্লডিয়াস। সে সময় ভ্যালেন্টাইন নামে একজন সাধু ছিল, যিনি তরুণ প্রেমিক-প্রেমিকাদেরকে গোপন পরিণয়-মন্ত্রে দীক্ষা দিত। এ অপরাধে সম্রাট ক্লডিয়াস সাধু ভ্যালেন্টাইনের শিরশ্ছেদ করেন। আর যেদিন তাকে শিরশ্ছেদ করা হয়, সেদিনটি ছিল ১৪ই ফেব্রুয়ারী। তার এ ভ্যালেন্টাইন নাম থেকেই এ দিনটির নাম করণ করা হয় ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’ যা আজকের ‘বিশ্ব ভালবাসা দিবস’।

    বাংলাদেশে এ দিবসটি পালন করা শুরু হয় ১৯৯৩ ইং সাল থেকে। কিছু ব্যবসায়ীর মদদে এটি প্রথম চালু হয়। অপরিণামদর্শী মিডিয়া কর্মীরা এর ব্যাপক কভারেজ দেয়। আর যায় কোথায়! লুফে নেয় তাকে বাংলার তরুণ-তরুণীরা। এরপর থেকে মুসলমানের মধ্যে বৈধ ভালবাসার পরিবর্তে অবৈধ ভালোবাসা বেঁধে দেয়ার কাজটা যথারীতি চলছে। আর এর ঠিক পিছনেই মানব জাতির আজন্ম শত্রু মিস্টার ইবলিস এইডস নামক মরণ-পেয়ালা হাতে নিয়ে খিলখিল করে হাসছে। মানুষ যখন বিশ্ব ভালবাসা দিবস সম্পর্কে জানত না, তখন পৃথিবীতে ভালবাসার অভাব ছিলনা। আজ পৃথিবীতে ভালবাসার বড়ই অভাব। তাই দিবস পালন করে ভালবাসার কথা স্মরণ করিয়ে দিতে হয়! আর হবেই না কেন! অপবিত্রতা নোংরামি ও শঠতার মাঝে তো আর প্রকৃত ভালোবাসা নামক বস্তুটি থাকতে পারে না। তাই আল্লাহ তায়ালা মানুষের হৃদয় মন থেকে ভালবাসা উঠিয়ে নিয়েছেন।

    বিশ্ব ভালোবাসা দিবসকে চেনার কিছু বাস্তব নমুনা :

    দিনটি যখন আসে তখন শিক্ষাঙ্গনের শিক্ষার্থীরা বিশেষ করে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা তো একেবারে বেসামাল হয়ে উঠে। নিজেদের রূপ-সৌন্দর্য উজাড় করে প্রদর্শনের জন্য রাস্তায় নেমে পড়ে। শুধুই কি তাই ! অঙ্কন পটীয়সীরা উল্কি আঁকার জন্য পসরা সাজিয়ে বসে থাকে রাস্তার মোড়ে মোড়ে। তাদের সামনে তরুণীরা পেট-পিঠ,বুক-বাহু আর হস্তদ্বয় মেলে ধরে পছন্দের উল্কিটি এঁকে দেয়ার জন্য। তারপর রাত পর্যন্ত নীরবে-নিবৃতে চলে প্রেমিক- প্রেমিকার অবৈধ আনন্দ উল্লাস। যেদিন অকালেই হাড়িয়ে ফেলে কত নারী তার সবচেয়ে মূল্যবান সতীত্ব। এ হলো বিশ্ব ভালোবাসা দিবসের কর্মসূচি! আমি বলি কি! এ দিবসটিকে বিশ্ব ভালবাসা দিবস না বলে বিশ্ব বেহায়াপনা দিবস বললে অন্তত নামকরণটি যথার্থ হতো।

    বিশ্ব ভালোবাসা দিবস পালনের ক্ষতিকর কিছু দিক :

    ☞ ভালোবাসা নামের এ শব্দটির সাথে এক চরিত্রহীন লম্পটের স্মৃতি জড়িয়ে যারা ভালোবাসার জয়গান গেয়ে চলেছে, পৃথিবীবাসীকে তারা সোনার পেয়ালায় করে নীল বিষ পান করিয়ে বেড়াচ্ছে।

    ☞ তরুণ তরুণদের সস্তা যৌন আবেগকে সুড়সুড়ি দিয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলা ও ফাসাদ সৃষ্টি করা হচ্ছে। অথচ আল্লাহ তায়ালা ফাসাদ সৃষ্টিকারীদের ভালোবাসেন না। আল্লাহ তায়ালা বলেন : তারা তো পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করে বেড়ায়। আর আল্লাহ ফাসাদ সৃষ্টিকারীদের ভালবাসেন না। (সূরা মায়িদা ৬৪ আয়াত।)

    ☞ নির্লজ্জতা ও বেহায়াপনা জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি লাভ করছে। যারা ঈমানদারদের সমাজে এ ধরণের অশ্লীলতার বিস্তার ঘটায়, দুনিয়া ও আখিরাতে তাদের জন্য আল্লাহ তায়ালা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির ব্যবস্থা করে রেখেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন : যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে তাদের জন্য আছে দুনিয়া ও আখিরাতে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি.. (সূরাহ নূর ১৯ আয়াত।)

    বস্তুত যে সমাজেই চরিত্র-হীনতার কাজ ব্যাপক, তথায় আল্লাহর নিকট থেকে কঠিন আযাবসমূহ ক্রমাগত অবতীর্ণ হওয়া অবধারিত। যেমন হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে : হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. থেকে বর্ণিত, হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : যে জনগোষ্ঠীর মধ্যে নির্লজ্জতা প্রকাশমান এবং তারা এর ব্যাপক প্রচারেরও ব্যবস্থা করে, তার অনিবার্য পরিণতি স্বরূপ মহামারি, সংক্রামক রোগ এবং ক্ষুধা-দুর্ভিক্ষ এত প্রকট হয়ে দেখা দিবে, যা তাদের পূর্ববর্তীদের মধ্যে কখনই দেখা যায় নি। (সুনানে ইবনে মাজাহ ৪০০৯ হাদীস।)

    ☞ তরুণ তরুণীরা বিবাহ পূর্ব দৈহিক সম্পর্ক গড়তে কোন রকম কুণ্ঠাবোধ করছে না। অথচ তরুণ ইউসুফ আলাইহিস সালামকে যখন মিশরের মহা এক রানী অভিসারে ডেকেছিল, তখন তিনি কারা বরণকেই এহেন অপকর্মের চেয়ে উত্তম জ্ঞান করেছিলেন। যুব-চরিত্রকে পবিত্র রাখার জন্য তিনি অতুলনীয় ও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন! আল্লাহ তায়ালা সূরা ইউসুফের ২৩-৩৪ নং আয়াত পর্যন্ত এ ঘটনা বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন।

    ☞ শরীরে উল্কি আঁকাতে যেয়ে নিজের ইজ্জত-আব্রু পরপুরুষকে দেখানো হয়। যা প্রকাশ্য কবিরা গুনাহ। যেমন হাদীস শরীফে হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : যে ব্যক্তি উল্কি আঁকে এবং যে আঁকায়, উভয়য়ের উপরই আল্লাহর লা‘নত। (সহীহুল বুখারী ৫৪৭৭ হাদীস।)

    মূলত যার লজ্জা নেই, তার পক্ষে এহেন কাজ নেই যা করা সম্ভব নয়। তাইতো হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : যদি তোমার লজ্জা না থাকে, তাহলে যা ইচ্ছা তুমি তাই করতে পার। (সহীহুল বুখারী ৩২২৫ হাদীস।)

    ☞ ভালোবাসা দিবসের নামে নির্লজ্জতা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে যিনা-ব্যভিচার, খুন-খারাবী ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। যেমন হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে : হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি : থেকে বর্ণিত, হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : যে জনগোষ্ঠীর-মধ্যে ব্যভিচার ব্যাপক হবে, তথায় মৃত্যুর আধিক্য ব্যাপক হয়ে দেখা দেবে। (মুয়াত্তা মালিক ৮৭০ হাদীস।)

    উপরোক্ত আয়াত ও হাদীসের ভাষ্য কতটা বাস্তব, বর্তমান বিশ্বের চিত্র এর প্রমাণ বহন করছে।

    সুতরাং আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী কোন মুসলমানের জন্য এ দিবস পালন করা বা এটাকে সমর্থন করা অথবা এ উপলক্ষে প্রেম-ভালোবাসা ও শুভেচ্ছা বিনিময় করা সম্পূর্ণ নাজায়েয ও হারাম। অতএব তা পরিহার করা ঈমানী দায়িত্ব!

    والله اعلم بالصواب
    লেখক :
    মুফতী তাহমীদ শামী
    আত-তাহমীদ রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ।
    তারিখ-১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৩ ঈসায়ী।

  • ৪৭০. তিন তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে পুনরায় গ্রহণের বিধান (হিল্লা বিয়ের আদ্যোপান্ত)

    প্রশ্ন :
    বরাবর
    মাননীয় মুফতী সাহেব।
    বিনয়ের সাথে জানতে চাচ্ছি যে,
    জনৈক স্বামী তার স্ত্রীকে বলেছে যে অমুক কথাটা তুমি তোমার ভাইকে বলবে না। কিন্তু স্ত্রী তা তার ভাইয়ের কাছে বলে ফেলে। অতঃপর স্বামী জানতে পেরে রাগ করে স্ত্রীকে ফোন করে বলেন যে, তুকে এক তালাক দুই তালাক তিন তালাক। অতঃপর ফোন কেটে দেয়। এরপর থেকে প্রায় দুই বছর এইভাবেই কেটে যায় এবং স্বামী আশ্বস্ত করেন যে ইহার একটি সমাধান বের করবেন। আর মাঝে মধ্যে তাদের মাঝে সাক্ষাৎ হত কিন্তু কখনো শারীরিক সম্পর্ক হয়নি। উনাদের দুইটা সন্তানও রয়েছে। উনারা আবার সংসার করতে চায় এমতাবস্থায় ওনাদের উপর শরিয়তের হুকুম কি.. কুরআন হাদিসের আলোকে সমাধান কি অনুগ্রহ করে জানাবেন।

    উত্তর

    ﺑﺴﻢ ﺍﻟﻠﻪ ﺍﻟﺮﺣﻤﻦ ﺍﻟﺮﺣﻴﻢ.

    বর্ণিত অবস্থায় স্ত্রীর উপর তিন তালাক পতিত হয়ে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে গেছে এবং স্বামী-স্ত্রী একে অন্যের জন্য হারাম হয়ে গিয়েছে। আর তিন তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীর জন্য স্বামীর সংসারে থাকা, স্বামীর সাথে দেখা-সাক্ষাত করা, কথা-বার্তা বলা ইত্যাদি সম্পূর্ণ হারাম। সুতরাং তারা দু-বছর যাবত হারাম কাজে লিপ্ত রয়েছেন। তাই এখনি পৃথক হয়ে যাওয়া ও তাওবা করা জরুরী।
    আর উক্ত অবস্থায় শরয়ী হিল্লা ব্যতীত স্বামী-স্ত্রী একে অন্যের জন্য হালাল হবেনা। নিম্নে বিস্তারিত আলোকপাত করা হলো। (সূরা বাকারা ২৩০ আয়াত। ফতোয়ায়ে শামী ৩/৪১০ পৃষ্ঠা। ফতোয়ায়ে কাসেমিয়া ১/৪৩৭ পৃষ্ঠা। ফতোয়ায়ে উসমানী ৩/৪৫৭ পৃষ্ঠা।)

    শরয়ী হিল্লা :

    কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে-
    ﻓَﺈِﻥ ﻃَﻠَّﻘَﻬَﺎ ﻓَﻠَﺎ ﺗَﺤِﻞُّ ﻟَﻪُ ﻣِﻦ ﺑَﻌْﺪُ ﺣَﺘَّﻰٰ ﺗَﻨﻜِﺢَ ﺯَﻭْﺟًﺎ ﻏَﻴْﺮَﻩُۗ ﻓَﺈِﻥ ﻃَﻠَّﻘَﻬَﺎ ﻓَﻠَﺎ ﺟُﻨَﺎﺡَ ﻋَﻠَﻴْﻬِﻤَﺎ ﺃَﻥ ﻳَﺘَﺮَﺍﺟَﻌَﺎ ﺇِﻥ ﻇَﻨَّﺎ ﺃَﻥ ﻳُﻘِﻴﻤَﺎ ﺣُﺪُﻭﺩَ ﺍﻟﻠَّﻪِۗ ﻭَﺗِﻠْﻚَ ﺣُﺪُﻭﺩُ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﻳُﺒَﻴِّﻨُﻬَﺎ ﻟِﻘَﻮْﻡٍ ﻳَﻌْﻠَﻤُﻮﻥَ.

    অতঃপর যদি স্ত্রীকে (তৃতীয়বার) তালাক দেয়া হয়,তবে সে স্ত্রী যে পর্যন্ত তাকে ছাড়া অপর কোন স্বামীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সে তার জন্য হালাল নয়। অত :পর যদি দ্বিতীয় স্বামী তালাক দিয়ে দেয়, তাহলে তাদের উভয়ের জন্যই পরস্পরকে পুনরায় বিয়ে করাতে কোন পাপ নেই। যদি আল্লাহর হুকুম বজায় রাখার ইচ্ছা থাকে। আর এই হল আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সীমা, যারা উপলব্ধি করে তাদের জন্য এসব বর্ণনা করা হয়। (সূরা বাকারা ২৩০ আয়াত।)

    হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে-
    عَنْ عَائِشَةَ ـ رضى الله عنها ـ جَاءَتِ امْرَأَةُ رِفَاعَةَ الْقُرَظِيِّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَتْ كُنْتُ عِنْدَ رِفَاعَةَ فَطَلَّقَنِي فَأَبَتَّ طَلاَقِي، فَتَزَوَّجْتُ عَبْدَ الرَّحْمَنِ بْنَ الزَّبِيرِ، إِنَّمَا مَعَهُ مِثْلُ هُدْبَةِ الثَّوْبِ‏.‏ فَقَالَ ‏ “‏ أَتُرِيدِينَ أَنْ تَرْجِعِي إِلَى رِفَاعَةَ لاَ حَتَّى تَذُوقِي عُسَيْلَتَهُ وَيَذُوقَ عُسَيْلَتَكِ ‏”‏‏.‏ وَأَبُو بَكْرٍ جَالِسٌ عِنْدَهُ…

    হযরত আয়িশা রাযি : থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন : রিফা‘আ কুরাযীর স্ত্রী হযরত নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট এসে বলল : আমি রিফা‘আর স্ত্রী ছিলাম। কিন্তু সে আমাকে একত্রে তিন তালাক প্রদান করে। পরে আমি আবদুর রহমান ইবনে যুবাইরকে বিয়ে করলাম। কিন্তু তার সঙ্গে রয়েছে কাপড়ের আঁচলের মতো নরম কিছু অর্থাৎ তার পুরুষত্ব নেই। তখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন : তবে কি তুমি রিফা‘আর নিকট ফিরে যেতে চাও? তা হয়না, যতক্ষণ না তুমি তার মধুর স্বাদ গ্রহণ করবে আর সে তোমার মধুর স্বাদ গ্রহণ করবে। সে সময় হযরত আবু বকর রাযি : নবীজীর দরবারে উপস্থিত ছিলেন। সনদ সহীহ। (সহীহুল বুখারী ২৬৩৯, ৫২৬০ হাদীস। সুনানে ইবনে মাজাহ ১৯৩২ হাদীস। সুনানে নাসায়ী ৩৪০৯ হাদীস। সুনানে আবু দাউদ ২৩০৯ হাদীস। সুনানে দারামী ২৩০৬ হাদীস। মুসনাদে আহমাদ ২৩৫৩৮ হাদীস।)

    শরয়ী হিল্লার নিয়ম :

    শরয়ী হিল্লা হলো- তিন তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে অন্যত্র বিবাহ দিবে এবং সেই স্বামীর সাথে স্বাভাবিক ঘর সংসার করতে থাকবে। এমনকি শারীরিক সম্পর্কও হতে হবে। তারপর উক্ত স্বামী যদি স্বেচ্ছায় স্ত্রীকে তালাক দেয় কিংবা স্বামী মৃত্যু বরণ করে, তবে ইদ্দত শেষ হলে পুনরায় প্রথম স্বামীর সাথে মহর ধার্য করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে এবং ঘর-সংসারও করতে পারবে। (সূরা বাকারা ২৩০ আয়াত। সহীহুল বুখারী ৫২৬০ হাদীস। সহীহ মুসলিম ১/৪৬৩ পৃষ্ঠা। ফতোয়ায়ে উসমানী ৩/৪৪৩ পৃষ্ঠা। ফতোয়ায়ে শামী ৩/৪১০ পৃষ্ঠা। ফতোয়ায়ে কাসেমিয়া ১/৪৩৭ পৃষ্ঠা।)

    প্রচলিত হিল্লার বিধান :

    প্রচলিত হিল্লা বিবাহ ইসলামে নিষিদ্ধ। তথা তালাকদাতা স্বামীর নিকট পুনরায় স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য যৌন মিলনের পর তালাক দেয়ার শর্তে কোন ব্যক্তির নিকট সাময়িক বিবাহ দেয়াকে হিল্লা বিবাহ বলা হয়। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ বিবাহকারী ও প্রদানকারী উভয়কে অভিসম্পাত করেছেন। যেমন হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে-
    عَنْ عَلِيٍّ قَالَ لَعَنَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم الْمُحَلِّلَ وَالْمُحَلَّلَ لَهُ.
    হযরত আলী রাযি : থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন : হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিন তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে হালালাকারী ও যার জন্য হালাল করা হয় উভয়ের উপর লানত করেছেন। সনদ সহীহ। (সুনানে ইবনে মাজাহ ১৯৩৫ হাদীস। সুনানে নাসায়ী ৩৪১৬ হাদীস। সুনানে তিরমিযী ১১১৯ হাদীস। সুনানে আবূ দাউদ ২০৭৬ হাদীস। সুনানে দারামী ২২৫৮ হাদীস।)

    অতএব প্রচলিত হিল্লা জায়েয নেই। তবে প্রচলিত হিল্লার উদ্দেশ্য ব্যতীত ঘটনাক্রমে যদি দ্বিতীয় স্বামী তালাক দিয়ে দেয়, তাহলে প্রথম স্বামীর জন্য হালাল হবে। (মুয়াত্তা ইমাম মুহাম্মাদ ৩০১ পৃষ্ঠা। ফতোয়ায়ে উসমানী ৩/৪৬১ পৃষ্ঠা। ফতোয়ায়ে কাসেমিয়া ১/৪৪২ পৃষ্ঠা।)

    ﻭﺍﻟﻠﻪ ﺍﻋﻠﻢ ﺑﺎﻟﺼﻮﺍﺏ.

    উত্তর লিখনে :
    মুফতী তাহমীদ শামী
    আত তাহমীদ ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ।
    তারিখ- ২১/৯/২০২৩ ঈসায়ী।

Back to top button