• ১৩৫. মাসজিদের ছাদে মোবাইল টাওয়ার বসানো সম্পর্কে

    ☞ প্রশ্ন

    মহামান্য মুফতি সাহেব হুজুর!

    মাসজিদের ছাদে বা দেয়ালে অথবা সিঁড়িতে মোবাইল টাওয়ার বসিয়ে মাসজিদের আয়ের উৎস বানানো কি জায়েয হবে? আমাদের মাসজিদের খতিব সাহেব ফতোয়া দিয়েছেন যে, জায়েয হবে। তিনি একজন মুফতিও বটে। ফতোয়াটি আরও তাহকীকের জন্য আপনার খেদমতে শরণাপন্ন হলাম, আশা করি তাহকীকপূর্ণ উত্তর দানে আমাদেরকে ধন্য করবেন।

    ইতি : আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী, হাফেয মাওলানা জুবায়ির আহমাদ, পেশ ইমাম, যাত্রাবাড়ী জামে মাসজিদ, ঢাকা।

     উত্তর :

    بسم الله الرحمن الرحيم

    মাসজিদ বা মাসজিদের কোনো অংশ, যেমন ছাদ, দেয়াল বা সিঁড়ি ইত্যাদির উপর টাওয়ার বসিয়ে আয়ের উৎস বানানো জায়েয নয়। এসব ভাড়া দেওয়াও জায়েয নয়। কেননা, মাসজিদ আল্লাহর ঘর। আর মাসজিদের মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর ইবাদত করা, আর আল্লাহর ইবাদত ব্যতীত অন্য কোনো কাজে বা দুনিয়ার কোনো স্বার্থে মাসজিদ বা মাসজিদের কোনো অংশ ব্যবহার করা জায়েয নয়। তবে মাসজিদের সিঁড়ি যদি মাসজিদের বাহিরে হয়, তবে তার উপর টাওয়ার বসানো জায়েয হবে।

    ☞ প্রামাণ্যগ্রন্থাবলী :

    ১. ফতোয়ায়ে শামী, ৩/৪০৩ পৃষ্ঠা।

    ২. ফতোয়ায়ে জামেয়া, ৬/৬০৮ পৃষ্ঠা।

    ৩. ফতোয়ায়ে রহিমিয়া, ৬/৯০ পৃষ্ঠা।

    ৪. ফতোয়ায়ে আলমগিরী, ৫/৩২১ পৃষ্ঠা।

    ৫. রদ্দুল মুহতার, ৩/৪০৩ পৃষ্ঠা।

  • ১৩০. বিভিন্ন প্রাণীর ডাকে শুভাশুভ নির্ণয় প্রসঙ্গে

    ☞ প্রশ্ন

    হযরত মুফতি সাহেব!

    অনেক লোক বলে, কাক ডাকলে নাকি শুভাশুভ ইঙ্গিত বোঝা যায়, যেমন—কারো বাড়ির সামনে কাক ডাকলে কোথাও তার কোনো আত্মীয় মারা যাওয়ার দুঃসংবাদ বোঝা যায়। আবার কেউ বলে—তার কোনো আত্মীয় বাড়িতে বেড়াতে আসবে বলে বোঝা যায়। তেমনি অনেকে বলে, হুতুম পেঁচা ডাকলে নাকি বিপদের সংকেত বোঝা যায়। আবার টিকটিকি ডাকলে বলে যে, সে নাকি তার কথার সমর্থন করে ইত্যাদি। এ ধরনের কথা বিশ্বাস করা কি ঠিক?

     উত্তর :

    بسم الله الرحمن الرحيم

    না, এরূপ ধারণা-বিশ্বাস সঠিক নয়। তা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ও কুসংস্কার। এগুলো হিন্দুদের থেকে মুসলমানদের ভিতরে প্রবেশ করেছে। মুসলমানদের এরূপ ধারণা-বিশ্বাস করা ঈমানের জন্য ক্ষতিকর।

    ইসলামের দৃষ্টিতে কাকের ডাক, পেঁচার ডাক, কুকুরের ডাক, টিকটিকির আওয়াজ ইত্যাদি কোনো কিছুতেই কোনো বিষয়ের ইঙ্গিত বা শুভাশুভ লক্ষণ নেই। বরং তারা তাদের মতো করে তাদের প্রকৃতিগতভাবে ডাকে। এতে মানুষের জন্য কোনো কিছু বোঝার নেই। বরং সকল ক্ষেত্রে সকল প্রকার শুভাশুভ মহান আল্লাহর হাতে। তিনি যখন যাকে কোনো ভালো বা মন্দ কোনো রূপ অবস্থার সম্মুখীন করার ইচ্ছা করেন, তখন তিনিই তা করেন। এতে অন্যের কোনো রূপ অংশীদারিত্ব নেই, বা অন্য কারো দ্বারা তা হতে পারে না। এক্ষেত্রে সেরূপ কিছু বিশ্বাস করলে তা শিরক—মহাপাপ হবে।

    والله أعلم

    ☞ প্রামাণ্যগ্রন্থাবলী :

    ১. সূরাহ আম্বিয়া, ৬৬ নং আয়াত।

    ২. সূরাহ ইউনুস, ১৮ নং আয়াত।

    ৩. সহীহ বুখারী, ৫৩১৬ নং হাদীস।

    ৪. সহীহ মুসলিম, ২২২০ নং হাদীস।

  • ১২৫. হায়েয, নেফাস ও ইস্তিহাযা সম্পর্কে

    ☞ প্রশ্ন

    মাননীয় মুফতি সাহেব!

    হায়েয, নেফাস ও ইস্তিহাযা কাকে বলে, এবং এগুলোর হুকুম কী? আর হায়েযের সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ মেয়াদ কতদিন? বিষয়টি বিস্তারিত জানালে চিরকৃতজ্ঞ হবো।

     উত্তর :

    بسم الله الرحمن الرحيم

    বালেগা মেয়েদের যোনিপথ দিয়ে স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী প্রতি মাসে যে রক্তস্রাব হয়, তাকে হায়েয বলে। হায়েযের সর্বনিম্ন মেয়াদ তিন দিন তিন রাত, আর সর্বোচ্চ মেয়াদ দশ দিন দশ রাত। অতএব, কারো যদি তিন দিন তিন রাতের কম সময় রক্তস্রাব হয়, অথবা দশ দিন দশ রাতের পরও রক্তস্রাব চলতে থাকে, তাহলে তা হায়েয নয়; বরং তা রোগ, আর এই রোগকেই শরীয়তের পরিভাষায় ইস্তিহাযা বলে। আর কোনো মেয়ের সন্তান প্রসবের পর যে রক্তস্রাব হয়, তাকে নিফাস বলে। নিফাসের সর্বনিম্ন মেয়াদের কোনো সীমা নেই; তা এক-আধ ঘণ্টাও হতে পারে। তবে নিফাসের সর্বোচ্চ মেয়াদ চল্লিশ দিন।

    হায়েয ও নিফাসের আহকাম হলো: হায়েয ও নিফাস চলাকালীন সময়ে নামায, রোযা, হজ্জ, কুরআন তিলাওয়াত বা কুরআন স্পর্শ করা, মসজিদে প্রবেশ করা এবং স্বামী-স্ত্রীর সহবাস ইত্যাদি জায়েয নয়; বরং হারাম। আর ইস্তিহাযা অবস্থায় এ সবই জায়েয। অর্থাৎ ইস্তিহাযার বিধান মাযুর ব্যক্তির ন্যায়।

    আর হায়েয-নিফাস অবস্থায় নামায মাফ; অর্থাৎ নামায কাযা আদায় করতে হয় না। কিন্তু রোযা মাফ নয়; রোযা কাযা আদায় করতে হবে।

    والله أعلم

    ☞ প্রামাণ্যগ্রন্থাবলী :

    ১. ফতোয়ায়ে শামী, ১/২০৮ পৃষ্ঠা।

    ২. ফতোয়ায়ে আলমগীরী, ১/৩৬ পৃষ্ঠা।

    ৩. ফতোয়ায়ে জামেয়া, ৩/১৯৭ পৃষ্ঠা।

    ৪. ফতোয়ায়ে রহমানিয়া, ১/২০৩ পৃষ্ঠা।

    ৫. আদ দুররুল মুখতার, ১/৩৬ পৃষ্ঠা।

    ৬. আল বাহরুর রায়েক, ১/১৯০ পৃষ্ঠা।

    ৭. বেহেশতী জেওর, ১/১৩০-১৩৮ পৃষ্ঠা।

    ৮. আল হিদায়া, ১/৩৬ পৃষ্ঠা।

    ৯. মারাকিউল ফালাহ, ৭৫ পৃষ্ঠা।

  • ১২১. খতমে তাহলীল সম্পর্কে

    ☞ প্রশ্ন

    আসসালামু আলাইকুম,

    জনাব মুফতি সাহেব!

    আশা করি আল্লাহ পাক ভালোই রেখেছেন।

    মুফতি সাহেব, আপনার কাছে একটি ফতোয়া জানতে চাই। আমি এক কিতাবে পড়েছি, কোনো কবরবাসীকে যদি সত্তর হাজার বার কালেমা পড়ে বখশিশ দেওয়া হয়, তাহলে আল্লাহ পাক তার কবরের আজাব মাফ করে দেন। আমি জানি, আল্লাহর রাস্তায় একবার সুবহানাল্লাহ পড়লে ৪৯ কোটি বার বলার সাওয়াব পাওয়া যায়। যদি আমি আল্লাহর রাস্তায় ৩ দিনের জন্য গিয়ে একবার কালেমা পড়ি, তাহলে ৪৯ কোটি সাওয়াব হবে, আল্লাহ চাহে। তখন আমি যদি তা বখশিশ দিয়ে দিই, তবে কি কবরবাসী মাফ পাবে?

    উত্তরটা জানতে পারলে অনেক উপকৃত হতাম।

     উত্তর :

    بسم الله الرحمن الرحيم

    সত্তর হাজার বার কালিমা পাঠ করে এর সাওয়াব মৃত ব্যক্তির নামে উৎসর্গ করলে সে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে বা তার কবরের আজাব মাফ হবে — এ কথাটি লোকমুখে রাসূলের হাদীস হিসেবে শোনা যায়। অথচ তা কোনো হাদীস নয়! এমনকি তা সহীহ কিংবা যয়ীফ কোনো সনদেও বর্ণিত হয়নি।

    তবে এ কথা স্বতঃসিদ্ধ যে, কালিমা পাঠ করা একটি সাওয়াবের কাজ। আর মৃত ব্যক্তির নামে ইসালে সাওয়াব করলে তা পৌঁছে থাকে, যা শরীয়তের অন্যান্য দলীল দ্বারা প্রমাণিত। কিন্তু এ নির্দিষ্ট সংখ্যা এবং উক্ত সাওয়াবের কথা কোনো দলীল দ্বারা প্রমাণিত নয়, এবং তা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীসও নয়।

    সুতরাং তা হাদীস মনে করে আমল করলে বিদআত হবে।

    والله أعلم

    ☞ প্রামাণ্যগ্রন্থাবলী :

    ১. ফতোয়া ইবনে তাইমিয়া, ২৪/৩২৩ পৃষ্ঠা।

    ২. প্রচলিত জাল হাদীস, ১/১৬২ পৃষ্ঠা।

  • ১১৯. ঝিনুকের মালা ইত্যাদি ব্যবহার করা সম্পর্কে

    ☞ প্রশ্ন

    আসসালামু আলাইকুম,

    মাননীয় মুফতি সাহেব!

    অনেককে দেখা যায় কক্সবাজার থেকে ঝিনুকের দানা দিয়ে তৈরি মালা, নাকের ফুল, কানের দুল, বিভিন্ন গহনা ইত্যাদি কিনে ব্যবহার করে বা ঘরে সাজিয়ে রাখে। আমার জানার বিষয় হলো, তা ব্যবহার করা বা ঘরে সাজিয়ে রাখা জায়েয আছে কি না?

     উত্তর :

    بسم الله الرحمن الرحيم

    হ্যাঁ, ঝিনুকের তৈরি মালা, গহনা ইত্যাদি ব্যবহার করা বা ঘরে সাজিয়ে রাখা জায়েয আছে। তা নাজায়েয হওয়ার কোনো কারণ নেই।

    والله أعلم

    ☞ প্রামাণ্যগ্রন্থাবলী :

    ১. ফতোয়ায়ে শামী, ৬/৩৫৯ পৃষ্ঠা।

    ২. ফতোয়ায়ে আলমগীরী, ৫/৩৩৫ পৃষ্ঠা।

    ৩. ফতোয়ায়ে রহমানিয়া, ২/৩৬৭ পৃষ্ঠা।

  • ১১৬. লাইলাতুল কদরের আলামত সম্পর্কে

    ☞ প্রশ্ন

    মহামান্য মুফতি সাহেব!

    শবে কদরের রাতটি চেনার সহীহ কোনো আলামত আছে কি? মেহেরবানী করে জানালে চির কৃতজ্ঞ হবো!

     উত্তর :

    بسم الله الرحمن الرحيم

    শবে কদরের রাতটি চেনার সহীহ কিছু আলামত হাদীসে পাওয়া যায়। যেমন—

    ১. রাতটি গভীর অন্ধকারে ছেয়ে যাবে না।

    ২. নাতিশীতোষ্ণ হবে, অর্থাৎ গরম বা শীতের তীব্রতা থাকবে না।

    ৩. মৃদুমন্দ বাতাস প্রবাহিত হতে থাকবে।

    ৪. সে রাতে ইবাদত করে মানুষ অপেক্ষাকৃত অধিক তৃপ্তিবোধ করবে।

    ৫. কোনো ঈমানদার ব্যক্তিকে আল্লাহ তায়ালা স্বপ্নে হয়তো তা জানিয়েও দিতে পারেন।

    ৬. ঐ রাতে বৃষ্টি বর্ষণ হতে পারে।

    ৭. সকালে হালকা আলোকরশ্মিসহ সূর্যোদয় হবে, যা হবে পূর্ণিমার চাঁদের মতো।

    ৮. সকল গাছপালা সিজদার হালতে থাকবে।

    والله أعلم

    ☞ প্রামাণ্যগ্রন্থাবলী :

    ১. বুখারী শরীফ, ২০২১ নং হাদীস।

    ২. মুসলিম শরীফ, ৭৬২ নং হাদীস।

    ৩. সহীহ ইবনু খুযাইমাহ, ২১৯০ নং হাদীস।

    ৪. ফাযায়েলে রমযান, ৪২৫ পৃষ্ঠা।

  • ১১২. ইশরাক, চাশত, আউয়াবীন, তাহাজ্জুদ ও যাওয়াল-এর সময় ও ফজীলত প্রসঙ্গে

    ☞ প্রশ্ন

    মুহতারাম মুফতি সাহেব!

    ইশরাক, চাশত, আউয়াবীন, তাহাজ্জুদ ও যাওয়ালের নামাযের সময় এবং এ নামাযসমূহের ফজীলত সম্পর্কে জানতে চাই। এ নামাযগুলোর গুরুত্ব কতটুকু এবং এ নামাযগুলো সুন্নাত না নফল? বিস্তারিত হাওয়ালাসহ জানালে কৃতজ্ঞ হবো!

    দোয়া করি আল্লাহ তায়ালা আপনার ইলম ও লিখনির মাঝে আরো বরকত দান করুন!

     উত্তর :

    بسم الله الرحمن الرحيم

    ইশরাক, চাশত, আউয়াবীন, তাহাজ্জুদ ও যাওয়ালের নামায নফল পর্যায়ের। রাসূলুল্লাহ (সা.) ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নাতের পর নফল আমলের প্রতি উম্মতকে উৎসাহিত করেছেন।

    নবী কারীম (সা.) ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তায়ালা বলেন— আমার বান্দা নফলের মাধ্যমে আমার নিকটবর্তী হতে থাকে। একপর্যায়ে সে আমার মাহবুব ও ভালোবাসার পাত্র হয়ে যায়। (সহীহ বুখারী, ২য় খণ্ড, ৯৬৩ পৃষ্ঠা)

    এরূপ নফল নামাযসমূহের মধ্যে তাহাজ্জুদ নামায ফজীলতের দিক দিয়ে অন্যতম। সেই সাথে ইশরাক, চাশত ও আউয়াবীন ইত্যাদি সময়সংশ্লিষ্ট নফল নামাযেরও অনেক ফজীলতের বর্ণনা হাদীস শরীফে এসেছে।

    এ ধরনের ফজীলতপূর্ণ নফল আমলের কারণে অন্যান্য নবীর উম্মতের তুলনায় এ উম্মতের বয়সসীমা কম হলেও এসব অতিরিক্ত আমলের দ্বারা ছাওয়াব বেশি হওয়ার মাধ্যমে অন্য সকল উম্মতের তুলনায় এ উম্মতের আমলের আধিক্য হবে বলে হাদীসে রয়েছে। তাই নিয়মিত ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নাত আমল আদায়ের পর যাদের সময়-সুযোগ হয়, তাদের এ নফল নামায এবং অন্যান্য নফল আমলে তৎপর হওয়া উত্তম নেক কাজ।

    নিম্নে ইশরাক, চাশত, আউয়াবীন, তাহাজ্জুদ এবং যাওয়ালের নামাযের সময় ও ফজীলত ক্রমানুসারে উল্লেখ করা হলো—

    ইশরাকের সময় ও তার ফজীলত

    ফজরের নামায পড়ার পর দুনিয়ার কাজকর্ম ও কথাবার্তা থেকে বিরত থেকে সূর্য ওঠা পর্যন্ত স্বীয় নামাযের জায়গায় বা (পুরুষগণ) মসজিদে অন্য কোনো জায়গায় বসে কুরআন তিলাওয়াত, যিকির-আযকার, তাসবীহ-তাহলীল ইত্যাদিতে লিপ্ত থাকবেন। অতঃপর সূর্যোদয়ের ১২/১৩ মিনিট পর সূর্য একটু উপরে উঠলে তখন ইশরাকের সময় হয়— ঐ সময় দুই রাক‘আত ইশরাকের নামায পড়লে এক হজ্ব ও এক উমরার সমান ছাওয়াব লাভ হবে বলে হাদীসে রয়েছে। (জামে তিরমিযী, ১ম খণ্ড, ১৩০ পৃষ্ঠা)

    এতদ্ব্যতীত আরো দুই রাক‘আতসহ মোট চার রাক‘আত নামায পড়লে আল্লাহ তায়ালা সন্ধ্যা পর্যন্ত তার এদিনের সকল কাজের জিম্মাদার হয়ে যান বলে অপর হাদীসে উল্লেখ আছে। (জামে তিরমিযী, ১ম খণ্ড, ১০৮ পৃষ্ঠা)

    অবশ্য যদি কেউ ফজরের নামাযের পর দুনিয়াবী কাজে লিপ্ত হয়ে যায় এবং সূর্য ওঠার পর ইশরাক পড়ে, তাও জায়িয আছে। এতেও ইশরাক আদায় হবে।

    চাশতের সময় ও তার ফজীলত

    সূর্য যখন আকাশে এক চতুর্থাংশ উপরে উঠে এবং সূর্যের তাপ প্রখর হয়, তখন থেকে দ্বিপ্রহরের আগ পর্যন্ত (৯টা থেকে ১১টার মধ্যে) চাশতের সময়। তখন দুই, চার বা আট রাক‘আত নামায পড়বেন। একে চাশতের নামায বলে। হাদীস শরীফে আছে— চাশতের দুই রাক‘আত নামাযে শরীরের সর্বমোট ৩৬০টি জোড়ার সদকা আদায় হয়ে যায় এবং সমুদ্রের ফেনার সমান গুনাহ (সগীরা) হলেও মাফ হয়ে যায়। অপর হাদীসে আছে— তার জন্য জান্নাতে একটি বালাখানা তৈরি করা হয়। এছাড়াও হাদীসে চাশতের নামাযের আরো অনেক ফজীলত বর্ণিত হয়েছে।

    আউয়াবীনের নামাযের সময় ও তার ফজীলত

    মাগরিবের ফরজ ও সুন্নাতের পর ইশার ওয়াক্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আউয়াবীনের নামাযের সময়। এ সময়ে নফলের নিয়তে কমপক্ষে ছয় রাক‘আত, ঊর্ধ্বে বিশ রাক‘আত পর্যন্ত এ নামায পড়া যায়। এ নামাযকে আউয়াবীনের নামায বলে।

    হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি মাগরিবের সুন্নাতের পর ছয় রাক‘আত নফল নামায পড়বে, সে বারো বছর ইবাদতের সমান ছাওয়াব লাভ করবে। (জামে তিরমিযী, ১ম খণ্ড, ৯৮ পৃষ্ঠা)

    তাহাজ্জুদ নামাযের সময় ও তার ফজীলত

    নফল নামাযসমূহের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে তাহাজ্জুদ নামায। পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরজ হওয়ার পূর্বে এ নামায ফরজ ছিলো। পরবর্তীতে তা নফল গণ্য হয়। এ নামায সম্পর্কে নবী কারীম (সা.) ইরশাদ করেন, ফরজ নামাযের পর শ্রেষ্ঠ নামায হলো— রাতের নামায (তাহাজ্জুদ)। (জামে তিরমিযী, ১ম খণ্ড, ৯৯ পৃষ্ঠা)

    শেষ রাতে ত্রিপ্রহরের সময় (সাহরীর সময়) থেকে সুবহে সাদিকের পূর্ব পর্যন্ত এ নামাযের সময়। তবে দিনের কঠোর পরিশ্রমে যাদের শেষ রাতে ওঠা অনিশ্চিত হয়, তারা ইশার পর ঘুমানোর পূর্বে তাহাজ্জুদের নিয়তে ২/৪ রাক‘আত নামায পড়ে নিতে পারেন। এরপর সম্ভব হলে আবার শেষ রাতে উঠে তাহাজ্জুদ পড়বেন। আর তখন না উঠতে পারলে প্রথম রাত্রির সেই নামাযের কারণে তাহাজ্জুদের ফজীলত থেকে একেবারে মাহরূম হবেন না, আশা করি।

    যাওয়ালের সময় ও তার ফজীলত

    ‘যাওয়ালের নামায’ একটি ফজীলতপূর্ণ নফল নামায। এ নামায দুপুরে সূর্য পশ্চিম দিকে ঢলে পড়ার সাথে সাথে আদায় করতে হয়। যেমন, নামাযের স্থায়ী সময়সূচি ক্যালেন্ডারে যোহরের যে শুরু ওয়াক্ত দেওয়া হয়, সেটাই সূর্য ঢলার সময়। সেই সময় হওয়ার সাথে সাথে যাওয়ালের নামায হিসেবে চার রাক‘আত নফল নামায পড়তে হয়।

    এ সময়ের নামাযের ফজীলত হলো— এ সময় আল্লাহ তায়ালা আসমানের সব দরজা খুলে দেন এবং সহজভাবে সব ইবাদত-বন্দেগী ও দু‘আ কবুল হয়। (জামে তিরমিযী, ৪৭৮ নং হাদীস)

    والله أعلم

    ☞ প্রামাণ্যগ্রন্থাবলী :

    ১. তিরমিযী শরীফ, ১ম খণ্ড, ১০৮ পৃষ্ঠা।

    ২. মিশকাত শরীফ, ১ম খণ্ড, ১১৬ পৃষ্ঠা।

    ৩. ফতোয়ায়ে শামী, ১ম খণ্ড, ৫০৬ পৃষ্ঠা।

    ৪. ফতোয়ায়ে আলমগীরী, ১ম খণ্ড, ১৪৮ পৃষ্ঠা।

    ৫. দুররে মুখতার, ১ম খণ্ড, ৪৯৮ পৃষ্ঠা।

    ৬. রদ্দুল মুহতার, ১ম খণ্ড, ৫০৬ পৃষ্ঠা।

    ৭. মারাকিউল ফালাহ, ২১৬, ২১৭ পৃষ্ঠা।

    ৮. বেহেশতী জেওর, ২য় খণ্ড, ২১২-২১৩ পৃষ্ঠা।

  • ১০৯. রোযা অবস্থায় স্বপ্নদোষ ও হস্তমৈথুন করা সম্পর্কে

    ☞ প্রশ্ন

    আসসালামু আলাইকুম মুফতি সাহেব!

    আশা করি ভালোই আছেন! আপনার নিকট আমার দুটি প্রশ্ন:

    ১. রমজান মাসে দিনের বেলা স্বপ্নদোষ হলে রোযা ভেঙে যাবে কি না? এবং এমন হলে করণীয় কী?

    ২. রোযা রেখে হস্তমৈথুন করলে রোযা ভেঙে যাবে কি না? এবং এ অবস্থায় করণীয় কী? বিস্তারিত জানালে উপকৃত হতাম!

     উত্তর :

    بسم الله الرحمن الرحيم

    ১. রোযা অবস্থায় দিনের বেলা স্বপ্নদোষ হলে রোযার কোনো ক্ষতি হয় না। তবে গোসল ফরয হয়। আর রোযা অবস্থায় ফরয গোসলের মধ্যে গরগরা করা এবং নাকের নরম জায়গা পর্যন্ত পানি পৌঁছানো যাবে না।

    ২. রোযা অবস্থায় হস্তমৈথুন করার দ্বারা রোযা ভঙ্গ হয়ে যায়। এবং উক্ত রোযাটি কাযা আদায় করা তার উপর ওয়াজিব হবে।

    والله أعلم

    ☞ প্রামাণ্যগ্রন্থাবলী :

    ১. ফতোয়ায়ে শামী, ২য় খণ্ড, ৩৯৬ পৃষ্ঠা।

    ২. ফতোয়ায়ে আলমগীরী, ২য় খণ্ড, ২৫০ পৃষ্ঠা।

    ৩. ফতোয়ায়ে জামেয়া, ২য় খণ্ড, ৬৪০ পৃষ্ঠা।

    ৪. ফতোয়ায়ে রহমানিয়া, ১ম খণ্ড, ৪৫৩ পৃষ্ঠা।

    ৫. ফতোয়ায়ে রহিমিয়া, ৭ম খণ্ড, ২৩৯ পৃষ্ঠা।

    ৬. রদ্দুল মুহতার, ২য় খণ্ড, ১০৯ পৃষ্ঠা।

    ৭. মারাকিউল ফালাহ, ১ম খণ্ড, ৪০৮ পৃষ্ঠা।

  • ১০৫. মহিলাদের জামাতে নামায আদায় করা সম্পর্কে

    ☞ প্রশ্ন

    জনাব মুফতি সাহেব দা:বা:!

    বর্তমান যুগে বিভিন্ন মসজিদে দেখা যায় মহিলারা পাঁচ ওয়াক্ত নামায জামাতের সাথে আদায় করে এবং তারাবীর নামাযও জামাতে আদায় করে এবং বিভিন্ন ঈদগাহে ঈদের নামাযও জামাতে আদায় করে, এমনকি জানাযার নামাযও জামাতে আদায় করে। জানার বিষয় হচ্ছে, মহিলাদের জন্য জামাতের সাথে নামায আদায় করা জায়েয আছে কি না? হাওয়ালাসহ জানালে কৃতজ্ঞ থাকবো!

     উত্তর :

    بسم الله الرحمن الرحيم

    জামাতে নামায, জুমুয়ার নামায, ঈদের নামায, জানাযার নামায মহিলাদের জন্য ওয়াজিব নয়। তারপরেও কোনো মহিলা যদি উক্ত নামাযসমূহ আদায় করে, তাহলে মাকরূহে তাহরীমী হবে। আর যে কোনো নামাযের জামাতে মহিলাদের অংশগ্রহণ করা মাকরূহে তাহরীমী। বরং মহিলাদের জন্য নামায আদায় করার সর্বোত্তম স্থান হলো গোপন অন্দরমহল।

    যেমন, হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: মহিলাদের জন্য ঘরে নামায আদায় করা বারান্দায় নামায আদায় করার চেয়ে উত্তম এবং ঘরের অন্দরমহলে নামায আদায় করা ঘরের সাধারণ অংশে নামায আদায় করার চেয়ে উত্তম। হাদীসে আরও বর্ণিত আছে: মহিলাদের জামাতে নামায আদায় করার চেয়ে একাকী নামায আদায় করায় ২৫ গুণ বেশি সাওয়াব রয়েছে।

    সুতরাং, মহিলাদের মসজিদে জামাতে নামায আদায় করা ফ্যাশন ছাড়া আর কিছুই নয়। কারণ, অধিক সাওয়াবই যদি তাদের উদ্দেশ্য হয়, তাহলে তো মসজিদের তুলনায় ঘরে অন্দরমহলে নামায আদায় করাই বেশি সাওয়াবের কাজ। তাহলে মসজিদে কেন যাবে অল্প সাওয়াব অর্জন করতে? অতএব, জামাতে নামায আদায় করা মহিলাদের জন্য বর্জন করা উচিত।

    والله أعلم

    ☞ প্রামাণ্যগ্রন্থাবলী :

    ১. ফতোয়ায়ে শামী, ১ম খণ্ড, ৪১৮ পৃষ্ঠা।

    ২. ফতোয়ায়ে আলমগীরী, ১ম খণ্ড, ৮৯ পৃষ্ঠা।

    ৩. ফতোয়ায়ে উসমানী, ২য় খণ্ড, ২৩৪ পৃষ্ঠা।

    ৪. ফতোয়ায়ে জামেয়া, ১ম খণ্ড, ১৪৬ পৃষ্ঠা।

    ৫. ফতোয়ায়ে রহমানিয়া, ১ম খণ্ড, ৩৭৩ পৃষ্ঠা।

    ৬. ফতোয়ায়ে রহিমিয়া, ১ম খণ্ড, ১৭১ পৃষ্ঠা।

    ৭. রদ্দুল মুহতার, ১ম খণ্ড, ৪১৮ পৃষ্ঠা।

    ৮. আবু দাউদ শরীফ, ১ম খণ্ড, ৪ পৃষ্ঠা।

  • ৯৯. সালাম সম্পর্কে

    ☞ প্রশ্ন

    আসসালামু আলাইকুম!

    মুহতারাম মুফতি সাহেব!

    সালামের পরিবর্তে আদাব, টাটা, বাই-বাই, গুড মর্নিং, গুড ইভিনিং, গুড নাইট ইত্যাদি বলা জায়েয আছে কি না? বিস্তারিত জানালে চির কৃতজ্ঞ হবো।

     উত্তর :

    بسم الله الرحمن الرحيم

    না, সালামের পরিবর্তে উক্ত শব্দগুলো বলা জায়েয হবে না। কেননা, উক্ত শব্দগুলো অমুসলিমদের অভিবাদনের শব্দ। আর অমুসলিমদের অভিবাদনের শব্দ মুসলিমদের অভিবাদনে প্রয়োগ করা জায়েয নয়। কারণ, হাদীস শরীফে হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: যারা অমুসলিমদের সাথে সামঞ্জস্য রাখে, তারা তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।

    আর সালামের বিষয়ে হযরত নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: তোমরা নিজেদের মধ্যে সালামের বিস্তার ঘটাও! বেশি বেশি সালাম দিলেই সালামের বিস্তার ঘটবে।

    এক মুসলমান আর এক মুসলমানের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ হলে সালাম দেওয়ার যে নিয়ম রাখা হয়েছে, এ নিয়ম যে কত সুন্দর নিয়ম, তা ব্যাখ্যা করে শেষ করা যায় না। সালামের মধ্যে শান্তির দোয়া করা হয়। “আসসালামু আলাইকুম”-এর অর্থ হলো: আপনাদের শান্তি হোক। আল্লাহ আপনাদের শান্তি দান করুন, রহমত দান করুন। সালামের মাধ্যমে শান্তির দোয়া করা হয়; এর চেয়ে ভালো দোয়া আর কী হতে পারে?

    ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্মে পারস্পরিক অভিবাদনের জন্য এত সুন্দর বাক্য আর নেই। যেমন কেউ কেউ বলে গুড মর্নিং বা গুড ইভিনিং অথবা গুড নাইট। যার বাংলা হলো শুভ সকাল বা শুভ সন্ধ্যা অথবা শুভ রাত। এ কথাগুলোর অর্থ অস্পষ্ট। সকাল সুন্দর বা বিকাল সুন্দর অথবা রাত সুন্দর — এ কথাগুলোর কী অর্থ? এর অর্থ কি এই যে, আজকের সকালটা খুব ফ্রেশ! আকাশটা খুব ফ্রেশ! বৃষ্টি-বাদল নেই! মেঘ নেই ইত্যাদি? যদি এই অর্থ হয়, তাহলে দেখা-সাক্ষাতের সময় এ শব্দগুলো বললে কার কী লাভ হবে? আর যদি উদ্দেশ্য হয় যে, আপনার সকালটা সুন্দর হোক, তাহলে বিকালটার কী দোষ? আর যদি বলা হয়, বিকালটা সুন্দর হোক, তাহলে সকালটার কী দোষ? আর যদি বলি সকাল-বিকাল সুন্দর হোক, এই সুন্দর কথাটাও তো অস্পষ্ট।

    কিন্তু সালামের অর্থ হলো: আপনাদের শান্তি হোক। আর শান্তির চেয়ে বড় কিছু কাম্য নেই। কারণ, আমরা সকলেই শান্তির মুহতাজ! জীবনের সকল ক্ষেত্রেই শান্তি চাই! দুনিয়াতেও শান্তি চাই! আখিরাতেও শান্তি চাই! আর সালামের মধ্যে এই শান্তির জন্যই দোয়া করা হয়। সুতরাং, আমাদের সকলের কর্তব্য হলো বেশি বেশি সালামের বিস্তার ঘটানো। আল্লাহ তাওফিক দান করুন!

    والله أعلم

    ☞ প্রামাণ্যগ্রন্থাবলী :

    ১. ফতোয়ায়ে জামেয়া, ৫ম খণ্ড, ৩৫০ পৃষ্ঠা।

    ২. ফতোয়ায়ে রহিমিয়া, ৬ষ্ঠ খণ্ড, ২৫৬ পৃষ্ঠা।

    ৩. জামেউল ফতোয়া, ৯ম খণ্ড, ২৩৭ পৃষ্ঠা।

    ৪. কিতাবুল ফতোয়া, ৬ষ্ঠ খণ্ড, ১২৫ পৃষ্ঠা।

    ৫. বুখারী শরীফ, ২য় খণ্ড, ৯২১ পৃষ্ঠা।

    ৬. মুসলিম শরীফ, ২য় খণ্ড, ২১৩ পৃষ্ঠা।

    ৭. তিরমিযী শরীফ, ২য় খণ্ড, ৯৯ পৃষ্ঠা।

    ৮. আবু দাউদ শরীফ, ২য় খণ্ড, ৭০৬ পৃষ্ঠা।

Back to top button