https://arwf.org/4/e8b5850750143f106f444143c77aa011
ঈমান আকিদা

১৬৯. শবে মিরাজের তাৎপর্য ও আমল সম্পর্কে

☞ প্রশ্ন

মাননীয় মুফতি সাহেব! কি বলে আপনাকে সম্বোধন করবো, সে ভাষা আমাদের জানা নেই! তবে আশা করি ভালো আছেন, সুখে আছেন এবং শান্তিতে আছেন। আর আমাদের কামনাও তাই। যাইহোক, আমরা কয়েকজন বান্ধবী ফতোয়ায়ে তাহমীদ পেইজের মাধ্যমে আপনার খেদমতে কয়েকটি প্রশ্ন পাঠালাম। আশা করি মেহেরবানী করে আমাদের প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রদান করবেন। প্রশ্নগুলো হলো এই— শবে মিরাজ কী? শবে মিরাজের তাৎপর্য কী? এবং শবে মিরাজের নির্দিষ্ট কোনো আমল আছে কি না? প্রমাণসহ জানালে অনেক উপকৃত হবো!

প্রশ্নকারিণী: ইডেন কলেজ, ঢাকার কয়েকজন ছাত্রী।

 উত্তর :

بسم الله الرحمن الرحيم

শরীয়তের দৃষ্টিতে শবে মি‘রাজ: মি‘রাজ আরবী ‘উরুজ’ শব্দ থেকে নির্গত, যার অর্থ ঊর্ধ্বে গমন করা। আর মি‘রাজ শব্দের অর্থ ঊর্ধ্বে আরোহণের বাহন। মি‘রাজের ঘটনা কখন সংঘটিত হয়েছিল, এ ব্যাপারে বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। তবে নির্ভরযোগ্য সূত্রে শুধু এতটুকুই পাওয়া যায় যে, মি‘রাজের ঘটনা হিজরতের এক বা দেড় বছর আগে সংঘটিত হয়েছিল। কিন্তু মাস, দিন তারিখের ব্যাপারে নির্ভরযোগ্য কোনো দলীল নেই। যদিও সাধারণ জনগণের মাঝে প্রসিদ্ধ হলো, রজব মাসের ২৭ তম তারিখে সংঘটিত হয়েছিল। (আল মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়াহ ও শরহুল মাওয়াহিবিল লাদুন্নিয়াহ ৮/১৮, ১৯ পৃষ্ঠা)

পরিভাষায় মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত রাত্রে ভ্রমণকে ইসরা, আর তথা হতে সিদরাতুলমুনতাহা ও তদূর্ধ্ব পর্যন্ত ভ্রমণকে মি‘রাজ বলা হয়। ইসরা ও মি‘রাজের ঘটনা সম্পর্কে কুরআনে কারীমে ইরশাদ হচ্ছে—

سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَىٰ بِعَبْدِهِ لَيْلًا مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا ۚ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ

অর্থ: পবিত্র ঐ মহান সত্তা, যিনি রাত্রি বেলায় তাঁর বান্দাকে মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত ভ্রমণ করিয়েছেন, যার আশপাশকে আমি বরকতময় করেছি। এটা এজন্য, যাতে আমি তাকে আমার নিদর্শনাবলী দেখাতে পারি।

(সূরা বনী ইসরাইল, ১ নং আয়াত)

হাদীসের আলোকে মি‘রাজের সংক্ষিপ্ত ঘটনা

একদা রাতে হযরত রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত উম্মে হানী রা.-এর ঘরে শুয়েছিলেন। রাসূলের অর্ধনিদ্রা অবস্থায় হযরত জিবরীল আ. অন্যান্য ফেরেশতাসহ অবতরণ করেন এবং হুযুর সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মসজিদে হারামে নিয়ে যান। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন হাতীমে কা‘বায় ঘুমিয়ে পড়েন। হযরত জিবরীল ও মীকাঈল আ. নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জাগিয়ে যমযমের পাশে নিয়ে সীনা মুবারক বিদীর্ণ করে অন্তরাত্মা বের করে যমযমের পানিতে ধুয়ে ইলম ও হিকমতে পরিপূর্ণ করে স্বর্ণের তশতরীতে রাখেন। অতঃপর পুনরায় বক্ষে স্থাপন করে দেন। এরপর বোরাক নামক বাহনে করে হুযুর সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত নিয়ে যান। অতঃপর সেখান থেকে আসমানে নিয়ে যান। প্রথম আসমানের নিকট গিয়ে জিবরীল আ. দরজা খোলার আবেদন জানান। ফেরেশতাগণ অভিবাদন জানিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বরণ করে নেন। এভাবে সপ্তম আসমান অতিক্রম করেন। এ সময়ে যথাক্রমে প্রথম আসমানে হযরত আদম আ., দ্বিতীয় আসমানে ইয়াহইয়া এবং ঈসা আ., তৃতীয় আসমানে হযরত ইউসুফ আ., চতুর্থ আসমানে হযরত ইদরীস আ., পঞ্চম আসমানে হযরত হারুন আ., ষষ্ঠ আসমানে হযরত মূসা আ., সপ্তম আসমানে হযরত ইবরাহীম আ.-এর সাথে সাক্ষাৎ হয়। সকলেই হুযুর সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অভ্যর্থনা জানান। সপ্তমাকাশ থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম রফরফ নামক বাহনের মাধ্যমে সিদরাতুলমুনতাহা ও আরশে আযীমে গমন করেন। সেখানে অনেক আশ্চর্য ও বিস্ময়কর জিনিস প্রত্যক্ষ করেন। জান্নাত জাহান্নাম স্বচক্ষে দেখেন। পরিশেষে আল্লাহর দীদার ও কালাম লাভে ধন্য হন। এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে উপঢৌকন স্বরূপ পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাযের বিধান নিয়ে জমিনের দিকে প্রত্যাবর্তন করেন। পথিমধ্যে হযরত মূসা আ.-এর পরামর্শক্রমে কয়েকবার আল্লাহর নিকট গিয়ে নামাযের সংখ্যা কমানোর আবেদন জানান। অবশেষে পাঁচ ওয়াক্ত নামায (যাতে পঞ্চাশ ওয়াক্তের সওয়াব পাওয়া যাবে) এর বিধান নিয়ে বাইতুল মুকাদ্দাস হয়ে মক্কায় ফিরে আসেন।

(বুখারী শরীফ, ৩৮৮৭ নং হাদীস; ফাতহুল বারী ৭/২৫০, ২৫৯ পৃষ্ঠা; খাসায়েসুল কুবরা ১/১৫২ পৃষ্ঠা)

রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মি‘রাজ স্বশরীরে হয়েছিল, স্বপ্নযোগে নয়

হুযুর সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মি‘রাজ জাগ্রত অবস্থায় স্বশরীরে হয়েছিল। তবে এছাড়া অন্য সময় হুযুরের স্বাপ্নিক মি‘রাজও হয়েছে, যার বর্ণনা হাদীস শরীফে এসেছে। তথাপি কতিপয় লোক রাসূলের স্বশরীরের মি‘রাজকে কিছু ভ্রান্ত যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে অস্বীকার করার চেষ্টা করে, যা আদৌ ঠিক নয়। মূলত প্রসিদ্ধ মি‘রাজ স্বশরীরে হওয়ার ব্যাপারে কুরআনের আয়াত ও অনেক সহীহ হাদীসসহ বিভিন্ন দলিল রয়েছে। তন্মধ্যে:

১. রূহানী মি‘রাজ কোনো আশ্চর্যের বিষয় নয়। বরং শারীরিক মি‘রাজই আশ্চর্যের বিষয়। এ দিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ তাআলা উক্ত ঘটনার বর্ণনার শুরু করেছেন ‘সুবহানা’ শব্দ দিয়ে। তাছাড়া উক্ত আয়াতে ‘বিআবদিহী’ (অর্থাৎ, নিজের বান্দাকে) শব্দ রয়েছে, যা মি‘রাজ স্বশরীরে হওয়ার প্রমাণ বহন করে।

২. মি‘রাজ যদি স্বাপ্নিক হতো তাহলে কেউ মুরতাদ হতো না। কারণ স্বপ্নের কোনো কিছুকে কেউ অস্বীকার করে না।

৩. স্বশরীরে মি‘রাজ হওয়ার ব্যাপারে উম্মতের ইজমা রয়েছে। অতএব প্রসিদ্ধ মি‘রাজকে রূহানী বা স্বাপ্নিক বলে ব্যক্ত করার কোনো অবকাশ নেই।

(শরহে যুরকানী ৮/১৩৮ পৃষ্ঠা)

মি‘রাজের শিক্ষা ও নসীহত

মি‘রাজের রাত্রে হুযুর সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর উম্মতকে তিনটি জিনিস হাদিয়া দেওয়া হয়।

১. এই উম্মতের যে কোনো ব্যক্তি শিরকমুক্ত ঈমান নিয়ে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হবে, আল্লাহ তাআলা তাকে চিরকাল আযাব দিবেন না। বরং তাকে একদিন অবশ্যই স্থায়ী জান্নাতে প্রবেশ করাবেন এবং চিরকালের জন্য আরামে রাখবেন।

২. পাঁচ ওয়াক্ত নামায। যে ব্যক্তি এই পাঁচ ওয়াক্ত নামাযকে গুরুত্ব সহকারে আদায় করবে, আল্লাহ তাআলা তাকে পঞ্চাশ ওয়াক্তের সওয়াব দিবেন এবং নিজ দায়িত্বে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।

৩. সূরায়ে বাকারার শেষ আয়াতসমূহ, যার মধ্যে এই উম্মতের প্রতি আল্লাহর পরিপূর্ণ রহমত, মাগফিরাত, দয়া ও অনুগ্রহ এবং কাফেরদের মুকাবেলায় সাহায্য ও সফলতার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। তাছাড়া এ আয়াতসমূহ রাত্রে ঘুমানোর পূর্বে পড়লে তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যায়। অর্থাৎ, তাহাজ্জুদের সওয়াবসহ সমস্ত বিপদ-আপদ থেকে সে ব্যক্তি হিফাযতে থাকে।

সুতরাং প্রত্যেক মুসলমানের জন্য জরুরী যে, প্রাথমিকভাবে এ তিনটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া এবং সঠিক ও সুন্দরভাবে তা হাসিল করা। সাথে সাথে দীনের অন্যান্য বিষয় অর্জনে সচেষ্ট হওয়া। বিশেষ করে দীনের যে পাঁচটি বিষয়ের ইলম অর্জনকে ফরযে আইন ঘোষণা করা হয়েছে, তা অবশ্যই হাসিল করা।

(সূরা বাকারা: ১৭৭ নং আয়াত; মুসলিম, ২৮৯ নং হাদীস)

শবে মি‘রাজ সম্পর্কিত বর্জনীয় বিষয়সমূহ

মি‘রাজের ঘটনা কোন্ বছর, কোন্ মাসের কোন্ তারিখে এবং কোন্ রাতে হয়েছিল, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মাঝে অনেক মতভেদ রয়েছে এবং এ রাতটি পৃথিবীর ইতিহাসে একবারই এসেছে। কিয়ামত পর্যন্ত আর কখনো মি‘রাজ সংঘটিত হবে না। সুতরাং কোনো একটা তারিখ চূড়ান্ত মনে করা ও অন্যান্যগুলিকে ভুল বলা যাবে না। অর্থাৎ, পরিপূর্ণ নিশ্চয়তার সাথে এ কথা বলা যায় না যে, কোন তারিখের কোন্ রাতে মি‘রাজের ঘটনা ঘটেছিল। শবে মি‘রাজের ইবাদত-বন্দেগীর ব্যাপারে কোনো ফজিলত কুরআন-হাদীসের মাধ্যমে প্রমাণিত নয়। সুতরাং সম্ভাব্য এই দিনে রোযা রাখা, শবে কদরের মতো এই রাতকে ফজিলতপূর্ণ মনে করা, রাতে ইবাদত-বন্দেগীতে মশগুল হওয়া, দিনে রোযা রাখা, সরকারীভাবে শবে মি‘রাজ পালনের উদ্যোগ নেওয়া, এই রাত্রকে উদ্দেশ্য করে মসজিদে ভীড় জমানো, মসজিদে আলোকসজ্জা করা, রাত্র জাগরণ করা, বাড়ী বাড়ী মিলাদ পড়া, প্রচার মাধ্যমে এ উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করা, পত্রপত্রিকায় বিশেষ নিবন্ধ প্রকাশ করা, শবে মি‘রাজ উপলক্ষে হালুয়া রুটির আয়োজন করা ইত্যাদি কোনটাই সহীহ নয়। শবে মি‘রাজ যদি শবে বরাত বা শবে কদরের মতো ফজিলতপূর্ণ কোনো ইবাদতের রাত হতো, তাহলে তার দিন তারিখ সংরক্ষিত থাকতো। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এ ব্যাপারে হাদীস বর্ণিত হতো। সাহাবায়ে কেরাম রা.-এর কোনো না কোনো আমল পাওয়া যেতো। অথচ এ বিষয়ে কুরআন-হাদীসে কোনো আমলের কথা বর্ণিত নেই। অতএব বছরের অন্যান্য দিনের মতো স্বাভাবিক ইবাদত-বন্দেগী করাই আমাদের এ দিনের কর্তব্য।

(সূরায়ে মায়েদা: ৩ নং আয়াত; বুখারী, ২৬৯৭ নং হাদীস; মুসলিম, ৫৯৬ নং হাদীস)

রজব মাস শুরু হলেই প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দু‘আ খুব বেশি করে পড়তেন:

اَللّٰهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِيْ رَجَبَ وَشَعْبَانَ وَبَلِّغْنَا رَمَضَانْ

(আল্লাহুম্মা বারিকলানা ফী রজাবা ওয়া শা‘বান ওয়া বাল্লিগনা রমাযান)

অর্থ: হে আল্লাহ পাক! আপনি আমাদেরকে রজব ও শাবান মাসে বরকত দান করুন এবং রমযান শরীফ পর্যন্ত পৌঁছে দিন।

(তাবরানী শরীফ, ৩৯৩৯ নং হাদীস)

আর শরীয়তে আমল রূপে যা নির্ধারিত নেই, তা করাই বিদআত। অথচ আমাদের দেশে মি‘রাজ উপলক্ষে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন সভা, সেমিনার, মাহফিল ইত্যাদি অনুষ্ঠানে শবে মি‘রাজের গুরুত্ব ও ফজিলত সম্পর্কে বহু বানোয়াট কল্প-কাহিনী ও ভিত্তিহীন জাল-মওযূ‘ হাদীস বর্ণনা করা হয়। যেমন—

হাদীস বর্ণনা করা হয় যে, যে ব্যক্তি রজব মাসের ২৭ তারিখ অর্থাৎ মি‘রাজ দিবসে রোযা রাখবে, তার আমলনামায় ৬০ মাসের রোযার সওয়াব লেখা হবে। অথচ এ কথা কোনো সহীহ বা গ্রহণযোগ্য হাদীসে বর্ণিত হয়নি।

তেমনিভাবে হাদীস বর্ণনা করা হয়, যে ব্যক্তি ২৭ রজব (অর্থাৎ মি‘রাজের রাত্রিতে) ইবাদত করবে, তার আমলনামায় একশ’ বছরের ইবাদতের সওয়াব লেখা হবে। এটাও কোনো সহীহ বা গ্রহণযোগ্য হাদীসে বর্ণিত হয়নি।

রজব মাসের ২৭ তারিখের রাতের নামাযের ব্যাপারে উলামায়ে ইসলাম ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে, এটি প্রমাণযোগ্য নয়; বরং এটি বিদআত।

এমনিভাবে রজব মাসে বিশেষ ধরনের রোযা বা নামায আদায়ের ফজিলত সম্পর্কেও বহু জাল হাদীস শোনা যায়। এ বিষয়ে নিম্নে কতিপয় জাল হাদীস উদ্ধৃত হলো—

১. যে ব্যক্তি রজবের প্রথম রজনীতে মাগরিবের নামাযের পর বিশ রাক‘আত নামায আদায় করবে, যার প্রত্যেক রাক‘আতে সূরাহ ফাতিহা ও সূরা ইখলাস পড়বে… অতঃপর দীর্ঘ হাদীস বর্ণনা করা হয়। ইমাম ইবনুল জাউযী (রহ.) বলেন, হাদীসটি মওযূ‘। (কিতাবুল মওযূ‘আত ২/১২৩ পৃষ্ঠা)

২. যে ব্যক্তি রজবের দিবসে রোযা পালন করবে এবং চার রাক‘আত নামায আদায় করবে, যার প্রথম রাক‘আতে একশত বার আয়াতুল কুরসী পড়বে… ইত্যাদি ইত্যাদি। ইমাম ইবনুল জাউযী (রহ.) বলেন, হাদীসটি মওযূ‘। এর সনদে উসমান নামক রাবী রয়েছেন, যিনি মুহাদ্দিসগণের দৃষ্টিতে পরিত্যক্ত। (কিতাবুল মওযূ‘আত ২/১২৩ পৃষ্ঠা)

৩. যে ব্যক্তি রজবের রজনীতে চৌদ্দ রাক‘আত নামায আদায় করবে, যার প্রত্যেক রাক‘আতে সূরাহ ফাতিহা একবার, কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ বিশবার, কুল আঊযু বিরাববিল ফালাক্ব তিনবার, কুল আঊযু বিরাববিন নাস তিনবার পড়বে। অতঃপর নামায হতে ফারেগ হয়ে দশবার দরূদ পড়বে… ইত্যাদি। ইমাম ইবনুল জাউযী (রহ.) বলেন, হাদীসটি মওযূ‘। (কিতাবুল মওযূ‘আত ২/১২৩ পৃষ্ঠা)

৪. অনেককে এ মাসে সালাতুর রাগায়েব আদায়ের ফজিলত বর্ণনা করতে দেখা যায় যে, রজব মাসের প্রথম বৃহস্পতিবার যে ব্যক্তি রোযা রাখবে, তারপর ইশার নামাযের পর রাত শেষ হওয়ার পূর্বে বারো রাকাত নামায পড়বে, প্রতি রাক‘আতে এক বার সূরাহ ফাতেহা পড়বে এবং তিন বার ইন্না আনযালনাহু ফি লাইলাতিল কাদরি পড়বে, আর ১২ বার কুল হুআল্লাহু আহাদ পড়বে, প্রতি দু’রাকাত অন্তে সালাম ফিরাবে, নামায থেকে ফারেগ হয়ে সত্তুর বার দরুদ পাঠ করবে, নামাযের সিজদাসমূহে সুব্বুহুন কুদ্দুসুন রাব্বুনা ওয়া রাব্বুল মালায়িকাতি ওয়ার রুহ সত্তুর বার পড়বে, সিজদা থেকে মাথা উঠিয়ে সত্তুর বার রব্বিগফির ওয়ারহাম ও তাজাওয়ায ‘আম্মা তা‘লাম— ইন্নাকা আনতাল আযীযুল আ‘যাম পড়বে, আল্লাহ তার প্রয়োজন মিটিয়ে দেবেন। এই নামাজ আদায় করলে আদায়কারী পুরুষ হোক বা নারী— আল্লাহ তার সমস্ত পাপ মোচন করে দেবেন। হোক না তা সমুদ্রের ফেনা, পৃথিবীর তাবৎ বালি-কণা, বৃক্ষরাজির পত্রসংখ্যা ও পর্বতমালার ওজন পরিমাণ। এরপর কেয়ামত দিবসে তার পরিবারের মধ্যে দোজখ অবধারিত হয়ে গিয়েছে এমন সাতশ ব্যক্তির ব্যাপারে তাকে শাফাআতকারী হিসেবে গ্রহণ করা হবে। এটাও সম্পূর্ণ মওযূ‘ ও বানোয়াট হাদীস— যা গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লামা নববী (রহ.) বলেন: এটি একটি জঘন্য বিদ‘আত। তা কঠিনভাবে পরিত্যাজ্য। এতে বহু মুনকার শামিল রয়েছে। আল্লামা ইবনে নাহ্হাস (রহ.) বলেন: এটি জঘন্য বিদ‘আত। এ ব্যাপারে বর্ণনাকৃত হাদীসসমূহ মওযূ‘ ও বানোয়াট।

সুতরাং, শবে মিরাজ উপলক্ষে নামায, রোযাসহ যে কোনো ইবাদতই বিদআত ও পরিত্যাজ্য। তাছাড়া, হযরত উমর রা. এই দিনে যারা রোযা রাখত তাদেরকে পিটিয়ে রোযা ভঙ্গ করাতেন এবং বলতেন যে, মনমতো চলার নাম দ্বীন নয়, বরং দ্বীন হচ্ছে আনুগত্যের নাম।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে বোঝার ও আমল করার তাওফিক দিন।

والله أعلم بالصواب

☞ প্রামাণ্যগ্রন্থাবলী :

১. বুখারী শরীফ, ৩৮৮৭ নং হাদীস।

২. মুসলিম শরীফ, ২৮৯ নং হাদীস।

৩. ফাতহুল বারী ৭/২৫০ পৃষ্ঠা।

৪. শরহে যুরকানী ৮/১৩৮ পৃষ্ঠা।

৫. খাসায়েসুল কুবরা ১/১৫২ পৃষ্ঠা।

৬. কিতাবুল মওযূ‘আত ২/১২৩ পৃষ্ঠা।

৭. আল ফাউয়ায়েদুল মাযমুয়া ১/৭৩-৭৫ পৃষ্ঠা।

৮. আল লায়ালিল মাসনুয়া ২/৫৫-৫৯ পৃষ্ঠা।

৯. তাবয়ীনুল আজব ১২৫ পৃষ্ঠা।

১০. আসারুল মারফুয়া ৫৮-৭০ পৃষ্ঠা।

১১. তানযিহুস শরীয়া ২/৮৯ পৃষ্ঠা।

১২. প্রচলিত জাল হাদীস ১/১৩৯-১৪১ পৃষ্ঠা।

Leave a Reply

Back to top button