প্রশ্ন :
বরাবর
মাননীয় মুফতী সাহেব।
বিনয়ের সাথে জানতে চাচ্ছি যে,
জনৈক স্বামী তার স্ত্রীকে বলেছে যে অমুক কথাটা তুমি তোমার ভাইকে বলবে না। কিন্তু স্ত্রী তা তার ভাইয়ের কাছে বলে ফেলে। অতঃপর স্বামী জানতে পেরে রাগ করে স্ত্রীকে ফোন করে বলেন যে, তুকে এক তালাক দুই তালাক তিন তালাক। অতঃপর ফোন কেটে দেয়। এরপর থেকে প্রায় দুই বছর এইভাবেই কেটে যায় এবং স্বামী আশ্বস্ত করেন যে ইহার একটি সমাধান বের করবেন। আর মাঝে মধ্যে তাদের মাঝে সাক্ষাৎ হত কিন্তু কখনো শারীরিক সম্পর্ক হয়নি। উনাদের দুইটা সন্তানও রয়েছে। উনারা আবার সংসার করতে চায় এমতাবস্থায় ওনাদের উপর শরিয়তের হুকুম কি.. কুরআন হাদিসের আলোকে সমাধান কি অনুগ্রহ করে জানাবেন।
উত্তর
ﺑﺴﻢ ﺍﻟﻠﻪ ﺍﻟﺮﺣﻤﻦ ﺍﻟﺮﺣﻴﻢ.
বর্ণিত অবস্থায় স্ত্রীর উপর তিন তালাক পতিত হয়ে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে গেছে এবং স্বামী-স্ত্রী একে অন্যের জন্য হারাম হয়ে গিয়েছে। আর তিন তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীর জন্য স্বামীর সংসারে থাকা, স্বামীর সাথে দেখা-সাক্ষাত করা, কথা-বার্তা বলা ইত্যাদি সম্পূর্ণ হারাম। সুতরাং তারা দু-বছর যাবত হারাম কাজে লিপ্ত রয়েছেন। তাই এখনি পৃথক হয়ে যাওয়া ও তাওবা করা জরুরী।
আর উক্ত অবস্থায় শরয়ী হিল্লা ব্যতীত স্বামী-স্ত্রী একে অন্যের জন্য হালাল হবেনা। নিম্নে বিস্তারিত আলোকপাত করা হলো। (সূরা বাকারা ২৩০ আয়াত। ফতোয়ায়ে শামী ৩/৪১০ পৃষ্ঠা। ফতোয়ায়ে কাসেমিয়া ১/৪৩৭ পৃষ্ঠা। ফতোয়ায়ে উসমানী ৩/৪৫৭ পৃষ্ঠা।)
শরয়ী হিল্লা :
কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে-
ﻓَﺈِﻥ ﻃَﻠَّﻘَﻬَﺎ ﻓَﻠَﺎ ﺗَﺤِﻞُّ ﻟَﻪُ ﻣِﻦ ﺑَﻌْﺪُ ﺣَﺘَّﻰٰ ﺗَﻨﻜِﺢَ ﺯَﻭْﺟًﺎ ﻏَﻴْﺮَﻩُۗ ﻓَﺈِﻥ ﻃَﻠَّﻘَﻬَﺎ ﻓَﻠَﺎ ﺟُﻨَﺎﺡَ ﻋَﻠَﻴْﻬِﻤَﺎ ﺃَﻥ ﻳَﺘَﺮَﺍﺟَﻌَﺎ ﺇِﻥ ﻇَﻨَّﺎ ﺃَﻥ ﻳُﻘِﻴﻤَﺎ ﺣُﺪُﻭﺩَ ﺍﻟﻠَّﻪِۗ ﻭَﺗِﻠْﻚَ ﺣُﺪُﻭﺩُ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﻳُﺒَﻴِّﻨُﻬَﺎ ﻟِﻘَﻮْﻡٍ ﻳَﻌْﻠَﻤُﻮﻥَ.
অতঃপর যদি স্ত্রীকে (তৃতীয়বার) তালাক দেয়া হয়,তবে সে স্ত্রী যে পর্যন্ত তাকে ছাড়া অপর কোন স্বামীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সে তার জন্য হালাল নয়। অত :পর যদি দ্বিতীয় স্বামী তালাক দিয়ে দেয়, তাহলে তাদের উভয়ের জন্যই পরস্পরকে পুনরায় বিয়ে করাতে কোন পাপ নেই। যদি আল্লাহর হুকুম বজায় রাখার ইচ্ছা থাকে। আর এই হল আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সীমা, যারা উপলব্ধি করে তাদের জন্য এসব বর্ণনা করা হয়। (সূরা বাকারা ২৩০ আয়াত।)
হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ عَائِشَةَ ـ رضى الله عنها ـ جَاءَتِ امْرَأَةُ رِفَاعَةَ الْقُرَظِيِّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَتْ كُنْتُ عِنْدَ رِفَاعَةَ فَطَلَّقَنِي فَأَبَتَّ طَلاَقِي، فَتَزَوَّجْتُ عَبْدَ الرَّحْمَنِ بْنَ الزَّبِيرِ، إِنَّمَا مَعَهُ مِثْلُ هُدْبَةِ الثَّوْبِ. فَقَالَ “ أَتُرِيدِينَ أَنْ تَرْجِعِي إِلَى رِفَاعَةَ لاَ حَتَّى تَذُوقِي عُسَيْلَتَهُ وَيَذُوقَ عُسَيْلَتَكِ ”. وَأَبُو بَكْرٍ جَالِسٌ عِنْدَهُ…
হযরত আয়িশা রাযি : থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন : রিফা‘আ কুরাযীর স্ত্রী হযরত নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট এসে বলল : আমি রিফা‘আর স্ত্রী ছিলাম। কিন্তু সে আমাকে একত্রে তিন তালাক প্রদান করে। পরে আমি আবদুর রহমান ইবনে যুবাইরকে বিয়ে করলাম। কিন্তু তার সঙ্গে রয়েছে কাপড়ের আঁচলের মতো নরম কিছু অর্থাৎ তার পুরুষত্ব নেই। তখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন : তবে কি তুমি রিফা‘আর নিকট ফিরে যেতে চাও? তা হয়না, যতক্ষণ না তুমি তার মধুর স্বাদ গ্রহণ করবে আর সে তোমার মধুর স্বাদ গ্রহণ করবে। সে সময় হযরত আবু বকর রাযি : নবীজীর দরবারে উপস্থিত ছিলেন। সনদ সহীহ। (সহীহুল বুখারী ২৬৩৯, ৫২৬০ হাদীস। সুনানে ইবনে মাজাহ ১৯৩২ হাদীস। সুনানে নাসায়ী ৩৪০৯ হাদীস। সুনানে আবু দাউদ ২৩০৯ হাদীস। সুনানে দারামী ২৩০৬ হাদীস। মুসনাদে আহমাদ ২৩৫৩৮ হাদীস।)
শরয়ী হিল্লার নিয়ম :
শরয়ী হিল্লা হলো- তিন তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে অন্যত্র বিবাহ দিবে এবং সেই স্বামীর সাথে স্বাভাবিক ঘর সংসার করতে থাকবে। এমনকি শারীরিক সম্পর্কও হতে হবে। তারপর উক্ত স্বামী যদি স্বেচ্ছায় স্ত্রীকে তালাক দেয় কিংবা স্বামী মৃত্যু বরণ করে, তবে ইদ্দত শেষ হলে পুনরায় প্রথম স্বামীর সাথে মহর ধার্য করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে এবং ঘর-সংসারও করতে পারবে। (সূরা বাকারা ২৩০ আয়াত। সহীহুল বুখারী ৫২৬০ হাদীস। সহীহ মুসলিম ১/৪৬৩ পৃষ্ঠা। ফতোয়ায়ে উসমানী ৩/৪৪৩ পৃষ্ঠা। ফতোয়ায়ে শামী ৩/৪১০ পৃষ্ঠা। ফতোয়ায়ে কাসেমিয়া ১/৪৩৭ পৃষ্ঠা।)
প্রচলিত হিল্লার বিধান :
প্রচলিত হিল্লা বিবাহ ইসলামে নিষিদ্ধ। তথা তালাকদাতা স্বামীর নিকট পুনরায় স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য যৌন মিলনের পর তালাক দেয়ার শর্তে কোন ব্যক্তির নিকট সাময়িক বিবাহ দেয়াকে হিল্লা বিবাহ বলা হয়। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ বিবাহকারী ও প্রদানকারী উভয়কে অভিসম্পাত করেছেন। যেমন হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ عَلِيٍّ قَالَ لَعَنَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم الْمُحَلِّلَ وَالْمُحَلَّلَ لَهُ.
হযরত আলী রাযি : থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন : হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিন তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে হালালাকারী ও যার জন্য হালাল করা হয় উভয়ের উপর লানত করেছেন। সনদ সহীহ। (সুনানে ইবনে মাজাহ ১৯৩৫ হাদীস। সুনানে নাসায়ী ৩৪১৬ হাদীস। সুনানে তিরমিযী ১১১৯ হাদীস। সুনানে আবূ দাউদ ২০৭৬ হাদীস। সুনানে দারামী ২২৫৮ হাদীস।)
অতএব প্রচলিত হিল্লা জায়েয নেই। তবে প্রচলিত হিল্লার উদ্দেশ্য ব্যতীত ঘটনাক্রমে যদি দ্বিতীয় স্বামী তালাক দিয়ে দেয়, তাহলে প্রথম স্বামীর জন্য হালাল হবে। (মুয়াত্তা ইমাম মুহাম্মাদ ৩০১ পৃষ্ঠা। ফতোয়ায়ে উসমানী ৩/৪৬১ পৃষ্ঠা। ফতোয়ায়ে কাসেমিয়া ১/৪৪২ পৃষ্ঠা।)
ﻭﺍﻟﻠﻪ ﺍﻋﻠﻢ ﺑﺎﻟﺼﻮﺍﺏ.
উত্তর লিখনে :
মুফতী তাহমীদ শামী
আত তাহমীদ ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ।
তারিখ- ২১/৯/২০২৩ ঈসায়ী।