হাদীসে রাসুল

আশুরার খানাপিনা গ্রহণযোগ্য হাদীস দ্বারা প্রমানিত

মুফতি তাহমিদ শামী

আশুরার দিনে ভালো ও উত্তম খানার আমল গ্রহণযোগ্য হাদীসে প্রমাণিত। তাই গ্রহণযোগ্য হাদীস না থাকার দাবি সঠিক নয়। এ আমল একাধিক সাহাবা,তাবেয়ী ও তৎপরবর্তী ইমামগণ থেকে অনুসৃত। তাঁরা আমল করে নিজ অভিজ্ঞতার কথাও বর্ণনা করেছেন।
এ সংক্রান্ত হাদীস একাধিক সাহাবী থেকে বর্ণিত। যেমন,
১৷ হযরত আবু সাঈদ খুদরী রাযি.(মুজামে আওসাত; তাবারানী-৯৩০২,শুআবুল ঈমান,বায়হাকী-৭/৩৭৭)
২৷ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. (মুজামে কাবীর, তাবারানী-১০০০৭,শুআবুল ঈমান,বায়হাকী-৭/৩৭৬-৩৭৭, মুআয্যিহু আওহামিল জামই ওয়াত তাফরীক,খতীব বাগদাদী-২/৩০৭)
৩৷ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. (আল-ইলালুল মুতানাহিয়া, ইবনুল জাওযী-২/৬২-৬৩,
দ্র.লিসানুল মীযান,ইবনে হাজার-৭/৩৭৫)
৪৷ হযরত আবু হুরায়রা রা. (শুআবুল ঈমান,বায়হাকী- ৫/৩৩৩, আখবারু আসবাহান, আবু নুআইম-১/১৯৮)
৫৷ হযরত জাবের বিন আব্দুল্লাহ রা. (শুআবুল ঈমান বায়হাকী-৭/৩৭৫, আলইসতিযকার,ইবনে আব্দুল বার-১০/১৪০)
এই পাঁচটি রিওয়ায়াতের মাঝে শেষ তথা হযরত জাবের রাযি. এর বর্ণনাটি তুলনামূলক শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য। তাঁর বর্ণনাকেই বিস্তারিত তুলে ধরছি।
জাবের রাযি. এর হাদীস ও সনদ বিশ্লেষণ৷ হযরত জাবের রাযি. এর হাদীসের একটি সনদ যা ইমাম ইবনে আবদুল বার রহ. (৪৬৩হি.) বর্ণনা করেছেন তা নিম্নরূপঃ
حدثنا أحمد بن قاسم ومحمد بن إبراهيم ومحمد بن حكم قالوا حدثنا محمد بن معاوية قال حدثنا الفضل بن الحباب قال حدثنا هشام بن عبد الملك الطيالسي قال حدثنا شعبة عن أبي الزبير عن جابر قال سمعت رسول الله صلى الله عليه و سلم يقول من وسع على نفسه وأهله يوم عاشوراء وسع الله عليه سائر سنته، قال جابر جربناه فوجدناه كذلك وقال أبو الزبير وقال شعبة مثله
এ সনদে সাহাবী হযরত জাবের রাযি. এর পরবর্তী তিনজন রাবী- (১) আবুয যুবায়ের৷
(২) শুবা৷
(৩) হিশাম বিন আব্দুল মালেক৷ তাঁদের সবাই সহীহ মুসলিমের রাবী। সবাই নির্ভরযোগ্য ও ছিকাহ। তাঁদের পরবর্তী রাবী ফযল বিন হুবাব আবূ খলীফা। তিনিও প্রসিদ্ধ ও ছিকাহ রাবী। ইমাম যাহাবী রহ. (৭৪৮হি.) তাঁর সম্পর্কে বলেনঃ
أبو خليفة الإمام الثقة محدث البصرة الفضل بن الحباب الجمحي البصري… وكان محدثا صادقا مكثرا عن طبقة الوقت حدث عنه أبو بكر الجعابي والطبراني والإسماعيلي وابن عدي وأبو الشيخ وأبو أحمد الغطريفى وخلق كثير وعاش مائة سنة غير أشهر. مات في جمادى الأولى سنة خمس وثلاثمائة…. وكان حسن المعرفة صاحب فنون.:
(তাযকিরাতুল হুফফায ২/৬৭০)
তিনি আরো বলেনঃ
وكان ثقة عالما. ما علمت فيه لينا إلا ما قال السليماني: إنه من الرافضة. فهذا لم يصح عن أبي خليفة.
(মীযানুল ইতিদাল ৪/৪২৩ (৬৭২৮)
ইবনে হিব্বান রহ. (৩৫৪হি) তাঁকে কিতাবুস সিকাতে (১৪৮৮৮) উল্লেখ করেছেন। মাসলামা বিন কাসিম রহ. বলেছেনঃ
كان ثقة مشهورا كثير الحديث
(লিসানুল মীযান ৬/৩৩৮)
আবু ইয়ালা খালীলী রহ. (৪৪৬হি.) বলেনঃ
منهم من وثقه ومنهم من تكلم فيه وهو إلى التوثيق أقرب
(আলইরশাদ ইলা মারিফাতি উলামায়িল হাদীস ২/৫২৬)
হাদীসের ইমামদের উল্লিখিত বক্তব্য দ্বারা প্রমাণিত হলো,আবু খলীফ ফযল বিন হুবাব একজন ছিকাহ রাবী। হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে তাঁর কোনো দুর্বলতা ছিলো না। ইমাম যাহাবী রহ. হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে তার দুর্বলতাকে নাকচ করে দিয়েছেন। যেমনটি উপরে উল্লেখ হয়েছে। তারপরের রাবী হলেন, মুহাম্মদ বিন মুআবিয়া। ইবনে হাযম রাহ. (৪৩৬হি.) সহ আরো অনেকই তাকে ছিকাহ বলেছেন। হাফেজ ইবনে হাজার রাহ. তা সমর্থন করেছেন। তিনি বলেন,
وشيوخ ابن عبد البر الثلاثة موثقون وشيخهم محمد بن معاوية هو ابن الأحمر راوي السنن عن النسائي وثقه ابن حزم ، وَغيره فالظاهر أن الغلط فيه من أبي خليفة فلعل ابن الأحمر سمعه منه بعد احتراق كتبه والله أعلم.
(লিসানুল মীযান ৬/৩৩৮)
এরপরের তিনজন রাবী এক সাথে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। ইবনে হাজার রহ. তিনজনকেই ছিকাহ বলেছেন। পূর্বের আলোচনা থেকে পরিষ্কার হয়েছে যে, হযরত জাবের রাযি. এর উক্ত হাদীসের সকল রাবীই ছিকাহ ও নির্ভরযোগ্য। হাদীসটি সহীহ না হওয়ার গ্রহণযোগ্য কোনো কারণও নেই। তাই হাদীসটি নির্ভরযোগ্য। আরও নিশ্চিত হওয়ার লক্ষে নিম্নে হাদীসের বড় বড় ইমামদের বক্তব্য পেশ করা হলোঃ
১৷ হাদীসের বিশিষ্ট ইমাম ও হাফিয আবুল হাসান ইবনুল কাত্তান রাহ. (৬২৮হি.) উল্লিখিত হাদীস সম্পর্কে বলেনঃ
إسناد هذا الحديث حسن، وإنما لم نصححه من أجل تدليس أبي الزبير، وهو لم يذكر سماعه من جابر لهذا الحديث، ومسلم يقبل روايته، وكيفما كانت فهو صحيح على مذهبه.
(ফাযায়িলে আশুরা,ইবনুল কাত্তান পৃ. ১৬ মাখতূতা)
২৷ হাদীসের ইমাম ও হাফিযুল হাদীস ইমাম ইরাকী রাহ. (৮০৬হি.) এ সনদটিকে সহীহ মুসলিমের মানে উত্তীর্ণ বলেছেন। এ সনদটিকে তিনি সর্বাধিক সহীহও বলেছেন। তিনি বলেনঃ
رواه ابن عبد البر في الاستذكار من رواية أبي الزبير عنه على شرط مسلم، قال البيهقي : هذه الأسانيد وإن كانت ضعيفة فهي إذا ضم بعضها إلى بعض أخذت قوة، وهذا مع كونه لم يقع له رواية أبي الزبير عن جابر التي هي أصح طرق الحديث. (انتهى من أماليه، نقلا عن اللآلي المصنوعة، والدرر المنتثرة للسيوطي.)
৩৷ আলোচ্যবিষয়ে একটি হাদীস হযরত আবু হুরায়রা রাযি. থেকেও বর্ণিত হয়েছে। হাদীসটি বিভিন্ন সনদে রয়েছে। তার মাঝে একটি সনদকে ইমাম ইবনে নাসের রাহ. সহীহ বলেছেন। কেউ কেউ হাসানও বলেছেন। যেমন ইমাম ইরাকী রাহ. বলেনঃ
قد ورد هذا الحديث عن أبي هريرة من طرق، صحح بعضها الحافظ أبو الفضل ابن ناصر، وبعضها حسن على رأي ابن حبان،…
৪৷ ইমাম বায়হাকী রাহ. (৪৫৮হি.) আলোচ্যবিষয়ে একাধিক হাদীস বর্ণনা করে বলেনঃ
هذه الأسانيد وإن كانت ضعيفة فهي إذا ضم بعضها إلى بعض أخذت قوة
(শুআবুল ঈমান ৫/৩৩৩)
৫৷ ইমাম মুনযিরী রাহ. (৬৫৬হি.) হযরত আবু হুরায়রা রাযি. এর হাদীস উল্লেখ করে ইমাম বায়হাকী রাহ. এর সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়ে বলেনঃ
رواه البيهقي وغيره من طرق وعن جماعة من الصحابة وقال البيهقي هذه الأسانيد وإن كانت ضعيفة فهي إذ ضم بعضها إلى بعض أخذت قوة والله أعلم
(আত-তারগীব ওয়াততারহীব- ১৫৩৬)
৫৷ হাফিয ইবনে হাজার রাহ. আবু সাঈদ খুদরী রাযি. এর হাদীস উল্লেখ করে বলেনঃ
ولولا الرجل المبهم لكان إسناده جيدا لكنه يقوى بالذي قبله وله شواهد عن جماعة من الصحابة غير أبي سعيد منهم عبد الله بن مسعود وعبد الله بن عمر وجابر وأبو هريرة وأشهرها حديث عبد الله بن مسعود
(আলআমালিউল মুতলাকা পৃ. ২৮)

৬৷ হাফিযুল হাদীস সুয়ূতী রাহ. (৯১১হি.) যারা হাদীসটি প্রমাণিত নয় বলেছেন তাদের কথা রদ্দ করে বলেনঃ
كلا بل هو ثابت صحيح، أخرجه البيهقي في “الشعب” من حديث أبي سعيد الخدري، وأبي هريرة، وابن مسعود، وجابر، وقال: أسانيده كلها ضعيفة، ولكن إذا ضم بضعها إلى بعض أفاده قوة.
(আদ্দুরারুল মুনতাছিরা পৃ. ১৯)
মালেকী মাযহাবের প্রসিদ্ধ ইমাম আবদুল মালিক রহ. আশুরার প্রামাণ্যতা ও ফযীলত বিষয়ে একটি কাসীদা লিখেছেন। কাসীদায় তিনি বলেনঃ
قال الرسول صلاة الله تشمله
قولا وجدنا عليه الحق والنورا
من بات في ليل عاشوراء ذا سعة
يكن بعيشته في الحول محبورا
ইমাম সয়ূতী রাহ. কাসীদাটি উল্লেখ করে বলেনঃ
وهذا من الإمام الجليل دليل على صحة الحديث والله أعلم
(আল্লাআলিউল মাসনূআ, সুয়ূতী ২/৯৬)
,
৭৷ আল্লামা ইবনে হাজার মাক্কী রাহ. (৯৭৪হি.) বলেনঃ
وما مر من أن التوسعة فيه لها أصل هو كذلك… وظاهر كلام البيهقي أن حديث التوسعة حسن على رأي غير ابن حبان أيضا فإنه رواه من طرق عن جماعة من الصحابة مرفوعا ثم قال وهذه الأسانيد وإن كانت ضعيفة لكنها إذا ضم بعضها إلى بعض أحدثت قوة وإنكار ابن تيمية أن التوسعة لم يرد فيها شيء عنه وهم لما علمت
(আসসাওয়ায়িকুল মুহরিকা; ইবনে হাজার মাক্কী ২/৫৩৬, প্র. মুআসসাসাতুর রিসালা)
৮৷ কাযী শাওকানী রাহ. (১২৫০হি.) বলেনঃ
وقد أطال الكلام عليه في اللآلىء بما يفيد أن طرقه يقوي بعضها بعضا
(আলফাওয়ায়িদুল মাজমুআ পৃ. ৯৮)
৯- বিশিষ্ট সালাফী আলেম সাইয়্যেদ সাবেক মারহুম (১৪২০হি.) বলেনঃ
للحديث طرق أخرى كلها ضعيفة، ولكن إذا ضم بعضها إلى بعض ازدادت قوة.
(ফিকহুস সুন্নাহ ১/৫১৯)

এখানে কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হলো যারা আশুরার দিন ভাল খানাপিনার ফযীলতকে সমর্থন করেছেন এবং হাদীসকে আমল ও গ্রহণযোগ্য বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। হাদীসটির নির্ভরযোগ্যতা নিছক সনদই নয়। বরং এর পিছনে সালাফের আমল ও তালাক্কীও বিদ্যমান। একাধিক সালাফ থেকে আমলটি বর্ণিত হয়েছে।

সংশয় নিরসনঃ
আলোচ্যবিষয়ে কোনো কোনো ইমাম ভিন্ন কথাও বলেছেন, যা ব্যাখ্যাসাপেক্ষ। আমাদের দেশের সালাফী ও লা-মাযহাবী ভায়েরা তাদের ব্যাখ্যাসাপেক্ষ কথা বিনা-বিচারে গ্রহণ করে তর্ক জুড়ে দেয়। প্রমাণিত হাদীসকে অস্বীকার করতে দ্বিধাবোধও করে না। তাদের এমন প্রবণতা সালাফী আলেমদের অন্ধ তাকলীদ থেকেই সৃষ্ট। যারা আলোচ্যবিষয়ে ভিন্ন মত দিয়েছেন তাঁদের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেয়ার পূর্বে একটি মূলনীতির ওয়াযাহাত ও স্পষ্ট হওয়া উচিত। ,
নীতিটি হলো, কোনো ইমাম যদি হাদীসের প্রামাণ্যতার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেন বা কোনো হাদীসকে মালূল বলেন, এবং অন্য কোনো ইমাম তার সাথে দ্বিমত পোষণ না করেন, তাহলে তাঁর সিদ্ধান্তটি বিনা দ্বিধায় গ্রহণীয় ও মান্য। আর যদি অন্য কোনো ইমাম তাঁর সাথে দ্বিমত পোষণ করেন, তাহলে বিনা দ্বিধায় গ্রহণীয় নয়। আহলে ইলমদের দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়, উভয়ের দলীল নিয়ে গবেষণা করে কোনো একটিকে প্রাধান্য দেয়া। অনেক ইমামই এ বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। এখানে হাফিযুল হাদীস ইবনে হাজার রাহ. এর বক্তব্যই তুলে ধরা যথেষ্ট মনে করছি। তিনি বলেনঃ
فإذا وجدنا حديثا قد حكم إمام من الأئمة المرجوع إليهم بتعليله فالأولى اتباعه في ذلك كما نتبعه في تصحيح الحديث إذا صححه. وهذا حيث لم يختلفوا فإذا اختلفوا فلا بد من الترجيح.
(আননুকাত আলা ইবনিস সালাহ ১/১১৪)
তিনি আরও বলেনঃ
فمتى وجدنا حديثا قد حكم إمام من الأئمة المرجوع إليهم – بتعليله – فالأولى إتباعه في ذلك كما نتبعه في تصحيح الحديث إذا صححه. وهذا حيث لا يوجد مخالف منهم لذلك المعلل، وحيث يصرِّح بإثبات العلة فأما إن وجد غيره صححه فينبغي حينئذ توجه النظر إلى الترجيح بين كلاميهما.
(প্রাগুক্ত ২/৭১১)
আলোচ্যবিষয়ে আমরা দেখেছি যে,হাদীসের একাধিক বিখ্যাত ইমাম ও হাফিয উক্ত হাদীসটিকে সহীহ,হাসান বলেছেন। এছাড়া অনেকেই সামগ্রিক দৃষ্টিতে আলোচ্য বিষয়টিকে প্রমাণিত বলে মত দিয়েছেন। সুতরাং এর বিপরীত কোনো মতামত আসলে তা বিনা বিবেচনায় গ্রহণ করার সুযোগ নেই। দলীল ও কারণ খুঁজে দেখতে হবে। এ মূলনীতি স্মরণ রাখলে নিম্নের আলোচনা বুঝতে সহজ হবে ইনশা আল্লাহ।
প্রথমত,পূর্ববর্তী কোনো ইমামই উপরোল্লিখিত আবুয যুবায়েরের সনদকে দুর্বল বা ভিত্তিহীন বলেননি। ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহ. সহ আরো যারা এ বিষয়ে কথা বলেছেন তারা কেউ আবুয যুবায়েরের সনদের কথা উল্লেখ করেননি। তাঁদের আলোচনা অন্য কোনো বর্ণনার সাথে সম্পৃক্ত। সুতরাং তা আবুয যুবায়েরের বর্ণনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। বিশিষ্ট হাদীস বিশারদ আহমদ সিদ্দীক গুমারী রহ. (১৩৮০) বলেনঃ
أما من ضعفه كالعقيلي وابن حبان وابن عدي وأمثالهم ممن خرجوا بعض طرقه في تراجم بعض الضعفاء، فإنهم لم يحكموا عليه إلا من تلك الطرق الضعيفة، ولم يتعرضوا لغيرها من الطرق التي تقع لهم، وهي التي على شرط الصحيح أو الحسن.
(হাদিয়্যাতুস সগরা পৃ.৭)
দ্বিতীয়ত, মুনকার হওয়ার আপত্তি। যারা হাদীসটিকে মুনকার বলেছেন তারাও উসূলভিত্তিক কোনো গ্রহণযোগ্য কোনো কারণ বা দলীল উপস্থিত করেননি। যেমন ইবনে হাজার রহ.। তিনি ‘আমালী’র মাঝে আলোচ্যবিষয়কে দলীলসিদ্ধ মেনে নিয়েছেন যেমনটি পূর্বে উল্লেখ হয়েছে। কিন্তু তিনি ‘লিসানুল মীযান’ কিতাবে আবুয যুবায়েরের হাদীসকে মুনকার বলেছেন। তবে নির্দিষ্টভাবে মুনকার হওয়ার কারণ উল্লেখ করেনি। সম্ভাবনা হিসেবে যা বলেছেন তাও আপত্তিমুক্ত নয়।
হাফিয ইবনে হাজার রহ. সনদের একজন রাবী ফযল বিন হুবাব আবূ খলীফাকে এ বর্ণনায় দুর্বল সাব্যস্ত করতে চেয়েছেন। তার ভাষ্য মতে আবু খলীফার কিতাব পুড়ে যাওয়ার পর তার স্মৃতিতে দুর্বলতা এসেছিলো। মুহাম্মদ বিন মুআবিয়া তার থেকে হাদীসটি কিতাব পুড়ে যাওয়ার পর গ্রহণ করেছেন। এ হাদীস বর্ণনা করতে আবু খলীফা ভুল করেছেন। আর মুহাম্মদ বিন মুআবিয়া সেভাবেই বর্ণনা করেছেন। (দ্র. লিসানুল মীযান ৬/৩৩৮)
হাফিয ইবনে হাজার রহ. কিতাব পুড়ে যাওয়ার যে আপত্তি তুলে ধরেছেন তা কয়েক কারণে শক্তিশালী নয়।
এক, আবু খলীফা একজন ছিকাহ রাবী। অনেকেই তাঁর প্রশংসা ও নির্ভরযোগ্য বলেছেন। আবু ইয়ালা খলীলী রহ. ব্যতীত কেউই তার কিতাব পুড়ে যাওয়ার তথ্য উল্লেখ করেননি। অথচ আবু ইয়ালা খলীলী রহ. প্রত্যক্ষদর্শী নন এবং তিনি কোনো সনদও বর্ণনা করেননি। এ কারণেই হয়ত অন্যরা তা উল্লেখ করেননি। বরং যাহাবী রহ. তার ব্যাপারে দূর্বলতাকে নাকচ করে বলেছেন, ما علمت فيه لينا ।
দুই, মুহাম্মদ বিন মুআবিয়ার সূত্রে আবু খলীফার অনেক হাদীসকেই ইমামগণ গ্রহণ করেছেন। যদি মুহাম্মদ বিন মুআবিয়া আবু খলীফা থেকে তার কিতাব পুড়ে যাওয়ার পরই শুনতেন তাহলে অন্যান্য বর্ণনাগুলো গৃহিত হত না। (দ্র. আলইসতিযকার)
তিন, উল্লিখিত ইমামগণ যারা এ সনদটিকে গ্রহণ করেছেন তাদের দৃষ্টিতেও হাফিয ইবনে হাজার রাহ. এর আপত্তিটি গৃহিত হয়নি।
সর্বোপরি সালাফের একাধিক ইমাম এ হাদীস অনুসারে আমল করেছেন। অনেকেই আমলটিকে দলীলসিদ্ধ বলেছেন। সামগ্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে হাদীসকেও গ্রহণযোগ্য বলেছেন। খোদ ইবনে হাজার রাহ. তা সমর্থন করেছেন। যেমনটি উপরে উল্লেখ হয়েছে।
তৃতীয়ত, শুবা রহ. এর আবুয যুবায়ের থেকে বর্ণনা করা কেন্দ্রিক আপত্তি। কেউ কেউ আপত্তি করেছেন উল্লিখিত সনদে ইনকিতা আছে। কারণ, শুবা রহ. আবুয যুবায়ের থেকে মাত্র একটি হাদীস বর্ণনা করে। (কিতাবুল মাজরুহীন ১/১৫১) আর এ হাদীসটি সেটি নয়। তাঁদের এ আপত্তিটিই যথার্থ নয়। কেননা, শুবা রাহ. মুদাল্লিস নন। তাঁর পরবর্তী কোনো রাবীও মুদাল্লিস নন। সুতরাং এখানে তাদলীস নেই এটিই স্বাভাবিক। যদি ইনকিতাকে মেনেও নেয়া হয়, তারপরও সনদ দুর্বল হবে না। কারণ শুবা রহ. সকল শায়েখ ছিকাহ ছিলেন। (আলজারহু ওয়াততাদীল ১/১২৮)
সুতরাং এখানে ইনকিতা থাকলেও যাকে হযফ করা হয়েছে তিনি যয়ীফ নন। এছাড়াও ইমাম আবুল হাসান ইবনুল কাত্তান আবুয যুবায়ের তাদলীসের কথা উল্লেখ করলেও এই ইনকিতার কথা উল্লেখ করেননি। এমনিভাবে ইমাম ইরাকী রহ.ও তা উল্লেখ করেননি। এমনকি হাফিয ইবনে হাজার রহ. অন্য আপত্তি তুললেও এই ইনকিতার কথা বলেননি। এ থেকেও বোঝা যায় যে, এ আপত্তিটি প্রভাবক নয়।
এ কয়েকটি আপত্তি ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো আপত্তি কেউ করেনি। কেউ কেউ অনুমান নির্ভর কথা বলেছেন, যা বিবেচ্য নয়। প্রকৃতপক্ষে সালাফীরা আল্লামা ইবনে তাইমিয়ার ভক্তিতে এ হাদীস নিয়ে বাড়তি সমালোচনায় লিপ্ত।
আশা করি পরিস্কার হয়েছে যে, খোদ মুহাদ্দিসগণের উসূল ও নীতির আলোকেই আমাদের আলোচ্য হাদীসটি মুনকার বা মালূল নয়। মুজতাহিদ মুহাদ্দিসগণের মানহাজ ও উসূল হিসেবে মালূল বলার আরো সুযোগ নেই। কেননা তারা ইল্লতের স্পষ্ট ও সন্তোষজনক ব্যাখ্যা ব্যতীত ছিকাহ রাবীর হাদীসকে মালূল বলেন না। ইমাম ইবনে দাকীকুল ঈদ রহ. এর ভাষায় বলা যায়,
ليس يتبين على طريقة الفقهاء وهم … ؛ فإن الثقة إذا روى اعتُمِدَت روايتُه إلا بِعِلَّةٍ بَيِّنَة
(আলইমাম ফি মারিফাতি আহাদিসিল আহকাম ৩/২০০)
আমরা দেখেছি যে, এখানে স্পষ্ট ও সন্তোষজনক কোনো কারণ নেই।
উপরোক্ত আলোচনায় আমরা দেখলাম, আশুরার দিনে তাওসিআ তথা ভাল খানাপিনা করা বিষয়ে নির্ভরযোগ্য একাধিক হাদীস ও সালাফের আমল বিদ্যমান রয়েছে। উসূলে হাদীসের বিচারেই হাদীসগুলো গ্রহণযোগ্য। সুতরাং একে ভিত্তিহীন বলা সঠিক নয়।

Leave a Reply

Back to top button